পূর্ণাঙ্গ ইসলাম বনাম আংশিক ইসলাম

প্রকাশিত: ডিসেম্বর ১৭, ২০২০
একটি গাড়িতে বহু ধরনের পার্টস থাকে। সেইসব পার্টস কিন্তু আলাদা আলাদাভাবে গাড়ি নয়, সবগুলো পার্টস যখন আপনি জায়গামত সেট করবেন, তখন যেই রুপটা দাঁড়াবে সেটা হলো গাড়ি। আপনি যদি কোনোদিন গাড়ি চলাচল না দেখেন, গাড়ি জিনিসটা কী জন্য তৈরি হয়েছে সেটা না বোঝেন তাহলে গাড়ির সমস্ত পার্টস আপনাকে আলাদা আলাদাভাবে দেওয়া হলে আপনি কখনই বুঝতে পারবেন না ওই পার্টসগুলো দিয়ে কী করতে হবে। মজার বিষয় হলো, গাড়ি জিনিসটা যেহেতু আপনি চেনেন না, কাজেই গাড়ির সবচেয়ে মূল্যবান অংশটা অর্থাৎ ইঞ্জিনটা আপনার কাছে সবচেয়ে অপ্রয়োজনীয় বিষয় মনে হতে পারে। আপনি হয়ত ইঞ্জিনটাকে একপাশে ফেলে রাখবেন, চাকাটাকে আরেকপাশে ফেলে রাখবেন, আর গাড়ির ক্যাসেট প্লেয়ারটাকে মনে করবেন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পার্ট। লুকিং গ্লাসকেই মনে হবে গাড়ির সবচেয়ে উপকারী জিনিস। সিটে আরাম করে ঘুমাবেন আর চিন্তা করবেন- গাড়ি জিনিসটা বোধহয় আরাম করে বসে গান শোনার জন্যই তৈরি করা হয়েছে। বিষয়টা যত হাস্যকরই মনে হোক- ইসলামের বেলায় আজ তেমনটাই হয়েছে। 

পূর্ণাঙ্গ ইসলাম বনাম আংশিক ইসলাম
ইসলামেরও অনেকগুলো পার্টস রয়েছে। পবিত্র কুরআনের আয়াত, হাদিসের বাণী, রসুলাল্লাহর জীবনী ইত্যাদি সবই ইসলামের ছোট বড় বিভিন্ন পার্টস। এই পার্টসগুলোকে যখন এক সূত্রে গাঁথা হবে, তখন সেটা হবে ইসলাম। আমাদের মুসলিম সমাজের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হলো এই যে, আমরা ইসলামের বিভিন্ন আমল, বিধি-বিধান, আইন-কানুন ও ঐতিহাসিক ঘটনাবলিকে এক সূত্রে গাঁথতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছি। আমরা কেবল কুরআন ও হাদিসের পাতায় খুঁজে বেড়িয়েছি ইসলামে কী আছে আর কী নাই। ইসলামে তো অনেক কিছুই আছে। ক্ষমাও আছে দণ্ডও আছে। যুদ্ধও আছে, সন্ধিও আছে। বিশ্বনবী মার খেয়েছেন, মার দিয়েছেনও। শত্রুর নির্যাতনের মুখে সাহাবীরা স্বদেশ ছেড়ে পালিয়েছেন যেমন, তেমনি শত্রুর উপর চড়াও হয়ে শত্রুকে নির্বাসনেও পাঠিয়েছেন। কাবার ৩৬০টা মূর্তি অপসারণ করেছেন যারা, তারাই আবার অন্য ধর্মের মানুষের উপাসনার মূর্তিকে পাহারা দিয়েছেন। মিশরে মূর্তির নাক কর্তনকারীকে সনাক্ত করতে ব্যর্থ হওয়ায় মুসলিম বাহিনীর আমির নিজের নাক পেতে দিয়েছেন খ্রিস্টান যাজকদের সামনে। ইসলামে শত্রুতার উদাহরণ আছে, মিত্রতার উদাহরণও আছে। এর মধ্যে কোনটার উদ্দেশ্য কী, কোনটার প্রয়োজনীয়তা কোথায়, কোনটা কখনকার কাজ, কীভাবে সেটার বাস্তবায়ন হবে ইত্যাদি আপনি তখনই বুঝতে পারবেন যখন আপনার কাছে ইসলামের সামগ্রিক ব্যাপারটা পরিষ্কার থাকবে। ইসলাম আসলে কী চায়, কেন চায়, কীভাবে চায় ইত্যাদি না জানলে আপনার উপমা ওই অন্ধ ব্যক্তির মত যে নিজ হাতে স্পর্ষ করেও বুঝতে পারল না হাতি কেমন। আমাদের ধর্মীয় নেতারা বর্তমানে একে অপরের সাথে যেই বাহাস-বিতর্কগুলো করে থাকেন এবং কোনো একটি বিষয়ে একমত হতে পারেন না, সেটারও কারণ নিহিত আছে এখানেই। তারা গাড়ির উদ্দেশ্য ভুলে গেছেন, গাড়ির ইঞ্জিন কোথায় পড়ে আছে সেই খবর তাদের কাছে নেই, কিন্তু বিতর্ক চালিয়ে যাচ্ছেন গাড়ির সিটে বসার সময় সিট বেল্ট বাঁধা ফরজ নাকি সুন্নত নাকি ওয়াজিব!

বস্তুত মুশকিলে পড়েছি আমরা হেযবুত তওহীদ। মুশকিলে পড়ার কারণ ইসলামের প্রকৃত আকিদা বা সামগ্রিক ধারণা আমরা জানলেও আমাদের ধর্মীয় নেতাদেরকে বোঝাতে পারছি না। আমাদের ধর্মীয় নেতাদের কাছে গিয়ে আমরা বলছি- ভাই, আপনারা সিট বেল্ট নিয়ে এত ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করছেন, ওদিকে গাড়ির ইঞ্জিন তো চোরে নিয়ে যাচ্ছে। সিট বেল্ট ছাড়াও গাড়ি চলবে, কিন্তু ইঞ্জিন ছাড়া তো গাড়ির মূল্যই থাকবে না। 

এ কথা শুনে তথাকথিত গাড়ি বিশেষজ্ঞগণ আমাদেরকে প্রশ্ন করছেন, “তোমাদের তো সাহস কম না? দুইদিনের বাচ্চা হয়ে তোমরা আমাদের গবেষণাকর্মে ভুল ধরার সাহস পাও কীভাবে? তোমরা কি জানো না- আমরা গত ১৩০০ বছর ধরে গাড়ির এইসব যন্ত্রাংশ নিয়ে হাজার হাজার গবেষণা চালিয়েছি? তোমরা কি জানো না আমাদের গবেষণার উপর ভিত্তি করে আমরা কত লক্ষ লক্ষ কিতাব রচনা করেছি? আগে সেইসব কিতাব পাঠ করে আসো তারপর তোমার সাথে কথা বলব।”

এই ধরনের কথা শোনার পরে এই গাড়ি বিশেষজ্ঞদেরকে কী করা দরকার তা আমি জানি কিন্তু বলব না।