ওয়াজ-মাহফিল হোক ধর্মব্যবসা ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত

প্রকাশিত: ডিসেম্বর ১৭, ২০২০

ওয়াজ-মাহফিল হোক ধর্মব্যবসা ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত
উপমহাদেশে, বিশেষ করে বাংলাদেশে ধর্মীয়সভা তথা ওয়াজ মাহফিল যত আড়ম্বরপূর্ণভাবে আয়োজিত হতে দেখা যায় তা বিশ্বের অপরাপর মুসলিম দেশগুলোতে দেখা যায় না। ঘটা করে প্রতিবছর একদিন থেকে শুরু করে সাতদিন কিংবা তারও অধিক সময় ধরে আমাদের দেশে মাহফিল হয়ে থাকে। ধর্মীয় অঙ্গনের এ সংস্কৃতির ইতিহাস খুব বেশি দূরের নয়। মাত্র কয়েক দশক। 

আজ থেকে পনেরো বিশ বছর আগে যখন ওয়াজ মাহফিলের আয়োজন হতো তখন দূরদূরান্ত থেকে ধর্মপ্রাণ মানুষ প্রচণ্ড শীত উপেক্ষা করে সেখানে হাজির হতেন। এসব মাহফিলে নবী রসুলদের জীবনী থেকে নানা ঘটনা তুলে ধরা হতো। পবিত্র কোরআনে যেসব ঘটনা মহান আল্লাহ তা’য়ালা তুলে ধরেছেন তার থেকে বেশি খুটিনাটি ও বিস্তারিত উঠে আসত এসব আলোচনায়। পাশাপাশি দৈনিন্দিন জীবনে অত্যাশবশ্যকীয় মাসলামাসায়েলও শেখানো হতো। এসব আলোচনা থেকে আধ্যাত্মিক পরিশুদ্ধির পাশাপাশি মানুষ ধর্মীয় বিষয়ে সচেতন হতো। কোনো একটা মাহফিলের হৃদয়বিদারী সুর ও আন্তরিক আলোচনা শ্রোতার মনে দাগ কাটত। দীর্ঘদিন এর প্রভাব তাদের মনে বিরাজ করত। 

এরই মধ্যে বিজ্ঞানের অভাবনীয় উন্নতিতে যোগাযোগব্যবস্থা এক লাফে অনেকদূর এগিয়ে গেছে। ইন্টারনেটের কল্যাণে ফেসবুক আর ইউটিউবের মতো যোগাযোগ মাধ্যমের সূচনা ঘটেছে। প্রাথমিক সময়ে ইন্টারনেটের গতি ও বিস্তৃতির অপ্রতুলতার কারণে সুবিধাপ্রাপ্ত জনগোষ্ঠীই ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ পায়। কিন্তু চলতি শতাব্দীর প্রথম দশকে থ্রি-জি, ফোর-জি ও ব্রডব্যান্ড লাইনের বিস্তৃতির ফলে এর ব্যবহার অভাবনীয় গতিতে বেড়ে যায়। ইতোমধ্যে হাতে হাতে পৌছেঁ গেছে স্মার্টফোন। উচ্চগতির ইন্টারনেট আর স্মার্টফোনের সমন্বয়ে এখন যত্রতত্র বসে ব্রাউজিং করা যাচ্ছে, ভিডিও শেয়ারিং করা যাচ্ছে। 

আমরা ছোটবেলায় যেখানে দেখতাম ওয়াজের মঞ্চে ওয়াজ হচ্ছে, এখন দেখছি সেসব ওয়াজ উঠে আসছে ফেসবুক- ইউটিউবে। কেবল আগ্রহী মানুষের আগ্রহেই নয়, এখন পেশাদার ওয়ায়েজীনগণ নিজস্ব উদ্যোগে ওয়াজ ভিডিও করাচ্ছেন এবং নিজস্ব চ্যানেল খুলে সেগুলো আপলোড করছেন। এতে করে জনপ্রিয়তার পাশাপাশি আর্থিকভাবেও তারা লাভবান হচ্ছেন। শীতের রাতে দূর-দূরান্তে কষ্ট করে যেখানে আগে ওয়াজ দেখতে/শুনতে হতো, সেখানে আজ ঘরে যখন তখন বসে ওয়াজ মাহফিলের স্বাদ গ্রহণ করা যাচ্ছে। এমনকি কোথাও কোথাও লাইভ ওয়াজও দেখতে পাওয়ার সুবিধা আছে। ধর্মীয় আলোচনা সহজলভ্য হওয়ায় ধর্মের শিক্ষা দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ছে- নিঃসন্দেহে এটা ভালো দিক।

কিন্তু ওয়াজের সহজলভ্যতার কারণে এই অঙ্গনে পেশাদার বক্তারও ছড়াছড়ি ঘটে গেছে। ধর্মীয় অঙ্গনের অনেক তালেবে এলেমদের এখন স্বপ্ন হয়ে গেছে একজন নামকরা বক্তা হওয়ার। কারণ, জনপ্রিয়তা ও সম্মানের পাশাপাশি এখন এ লাইনে প্রচুর আর্থিক সুবিধা পাওয়ারও সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। অনেক বক্তার এ বছরের শিডিউল গত বছরেই পূর্ণ হয়ে গেছে। সেগুলো থেকে এডভান্স সম্মানীও গ্রহণ করা হয়ে গেছে।

আগে যেখানে উল্লেখযোগ্য কিছু স্থানে মাহফিলের আয়োজন করা হতো সেখানে এখন প্রায় প্রতিটি মসজিদ মাদ্রাসায় বাৎসরিক মাহফিলের আয়োজন করা হয়। এছাড়াও নানা উপলক্ষ হাজির করে উৎসাহী আয়োজকগণ স্কুল-কলেজের মাঠ, খেলার মাঠেও ওয়াজ মাহফিলের আয়োজন করছেন। তারা চটকদার বক্তাদের দাওয়াত করে চাঁদা কালেকশন করেন। বক্তাদেরকে উচ্চহারে সম্মানী প্রদান করেও উত্তোলিত চাঁদায় তাদের লাভ হচ্ছে। ফলে এ লাইনে চটকদার, ব্যতিক্রম স্টাইল ও সূরের বক্তাদের চাহিদাও বাড়ছে। নিজস্ব চাহিদা ধরে রাখতে নানা ধরনের অঙ্গভঙ্গি, অভিনয়, সুর করে গান গাওয়া ইত্যাদিতে পারদর্শিতা প্রমাণ করার চেষ্টা করেন। বিগত কয়েকবছর ধরে এ ধরনের অপচেষ্টা অনেকদূর এগিয়েছে এবং সাধারণ মানুষের মাঝে এসব কর্মকাণ্ড বিরূপ প্রভাব ফেলেছে।

শুধু চটকদার ওয়ায়েজী নন, এ লাইনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মুখপাত্ররাও গরম গরম কথা বলে নিজস্ব মতবাদের বিস্তার ঘটানোর চেষ্টায় থাকেন। ভিন্ন ভিন্ন মতবাদের অনুসারী এসব বক্তারা দেশি-বিদেশি নানা ধরনের ইস্যু নিয়েও কথা বলে থাকেন। ইস্যুভিত্তিক ও রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে যারা কথা বলেন তাদের মাঝে অনেকেই প্রতিপক্ষকে হুমকি-ধামকি, জ্বালিয়ে দেওয়া-পুড়িয়ে দেওয়া, রক্তের গঙ্গা বইয়ে দেওয়ার হুঙ্কার ছাড়েন, অশ্লীল ভাষা ও অঙ্গভঙ্গি প্রদর্শন করেন। স্বার্থন্বেষী এসব গোষ্ঠী প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে মিথ্যাচারের পাশাপাশি গুজব ও হুজুগের সৃষ্টি করছেন। সাম্প্রদায়িক মনোভাবাপন্ন বক্তারা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টকারী বক্তব্য দিচ্ছেন। আবার অনেক ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত বক্তা বিজ্ঞানের বিষয়ে কথা বলছেন এবং উল্টাপাল্টা তথ্য দিয়ে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করছেন। ফলে ধর্মীয় কুসংস্কারের পাশাপাশি ধর্মীয় বিষয়ে উগ্রবাদী ও সহিংস মনোভাবের মানুষের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফেসবুক-ইউটিউবের কমেন্ট সেকশনে এসব বক্তা ও মতবাদের অনুসারী মাদ্রাসার তালেবে এলেম, দাড়ি-টুপি পরিহিতদের ভাষা ও ব্যবহার খোদ ইসলাম ধর্মের মর্যাদাকেই ভূলুন্ঠিত করছে।

এসব বক্তারা মাইক পেয়ে আঙুল উঁচিয়ে, উত্তেজনার চোটে মাইক্রোফোন উল্টেপাল্টে যেসব কথাবার্তা বলেন তা বৃহৎ পরিসরে সমাজকে দূষিত করছে। সরাসরি তারা নিজেরা কোনো অঘটন না ঘটালেও তাদের অনুসারীদের দ্বারা অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটছে। তারা যদি সুচিন্তিতভাবে ঠাণ্ডা মাথায় ধর্মীয় উপদেশ দিতেন তবে সেটা যেমন তাদেরকে নিজেদের উন্নতি ঘটাত তেমনি সাধারণ মানুষকেও ভদ্র, সভ্য বানাত। ধর্মীয় সভার যথাযথ মর্যাদা ও ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ আলোচনা বিরাজ না করায় এসব সভা জাতির জন্য ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়িয়েছে। সুতরাং যারা ওয়াজ মাহফিলকে উগ্রতা দিয়ে কলঙ্কিত করছেন তাদেরকে রুখে দেওয়ার সময় হয়েছে। এ বিষয়ে যথাযথ কর্তৃপক্ষকে কঠোর ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হবে। উত্তেজনা সৃষ্টি ও গুজব-হুজুগ তৈরিকারী এসব বক্তাদেরকে নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। তাহলে দেশ, সমাজ ও ধর্ম সমাজ এদের হাত থেকে সুরক্ষিত থাকবে।