আমাদের অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যৎ (পর্ব - ২)

প্রকাশিত: জানুয়ারী ২৮, ২০২১

আগের পর্ব - আমাদের অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যৎ

যাইহোক, সময় প্রবহমান। কালের স্রোত অনেক পরিবর্তন নিয়ে আসে। মুসলমানদের শাসনাধীন ভূখণ্ড বাড়তে লাগলো। জর্ডান, ফিলিস্তিন ছাড়িয়ে ইসলাম প্রবেশ করল উত্তর আফ্রিকার মিশর, লেবানন, তিউনিশিয়া হয়ে শেষ সীমানা মরোক্কো পর্যন্ত। ৭১১ খ্রিষ্টাব্দে উমাইয়া খলিফা ওয়ালিদ ইবনে আব্দুল মালিকের শাসনামলে তারিক বিন জিয়াদের নেতৃত্বে স্পেনের বেশির ভাগ অঞ্চল মুসলমানরা জয় করেন। এর মধ্য দিয়ে ইসলাম আফ্রিকা ছেড়ে ইউরোপ পর্যন্ত পৌঁছে যায়। এদিকে একই সময়ে পূর্ব দিকে আফগানিস্তান পার হয়ে সিন্ধু প্রদেশে (বর্তমান পাকিস্তানের অংশ) বিজয়াভিযান পরিচালনা করেন মোহাম্মদ বিন কাসেম। কিন্তু এই সময়ে এসে ঘটল এক মহা দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা। ইতোমধ্যেই সময়ের প্রবাহের সাথে একে একে বিদায় নিয়েছেন রসুলাল্লাহ (সা.) এর প্রাণপ্রিয় আসহাবগণ।মুসলিম শাসকগণ তখন ভোগ-বিলাসিতায় মত্ত হয়ে পড়েছেন। নারী-মদ সব কিছুতেই আসক্ত হয়েছেন দিনে দিনে। ইসলাম প্রতিষ্ঠার চেয়ে তারা সিংহাসন রক্ষা, সাম্রাজ্য বিস্তারকে প্রাধান্য দেওয়া শুরু করেছেন।

আমাদের অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যৎ
রসুলাল্লাহ (সা.) যে কারণে উম্মতে মোহাম্মদী নামক এই জাতি তৈরি করলেন সেই উদ্দেশ্যই তখন জাতি ভুলে বসলো। দীন প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম তারা ত্যাগ করল। এই কথাটা বোঝার জন্য আপনাকে ইতিহাস ঘাটতে হবে না, কেবল একটি প্রশ্ন উত্থাপন করলেই বুঝতে পারবেন। রসুলাল্লাহ (সা.) বিদায় নেবার মাত্র ১০০ বছরেরও কম সময়ে অর্ধ পৃথিবীতে যদি ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে বাকী পৃথিবীতে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হতে আর কত বছরের প্রয়োজন ছিল? রসুলাল্লাহ (সা.) কি তাদেরকে থেমে যেতে বলেছিলেন? আল্লাহ কি থামতে বলেছেন? না, বরং আল্লাহ বলেছেন, “আমি আমার আপন রসুলকে হেদায়াহ ও সত্যদীন দিয়ে পাঠিয়েছি যেন তিনি এটাকে অন্যান সমস্ত দীনের উপরে (সমগ্র পৃথিবীতে) প্রতিষ্ঠা করেন।” (সুরা তওবা- ৩৩, সুরা ফাতাহ- ২৮, সুরা সফ- ৯)।

৭১১ খ্রিষ্টাব্দে স্পেন, পর্তুগালে দীন প্রতিষ্ঠিত হলো, তাহলে কেন শত শত বছরেও তার পরবর্তী ইউরোপীয় ভূখণ্ডগুলোতে দীন ছড়িয়ে পড়ল না? কেন ফ্রান্স, ইটালি, সুইজারল্যান্ড, জার্মানিতে ইসলামের আলো তারা ছড়িয়ে দিতে পারল না? রসুলাল্লাহ (সা.) সামান্য কিছু আসহাব নিয়ে মাত্র ১০ বছরে ৩২ লক্ষ বর্গকিলোমিটার ভূখণ্ডে দীন প্রতিষ্ঠা করেছেন, তাঁর আসহাবগণ ৬০/৭০ বছরের মধ্যে তদানীন্তন প্রায় অর্ধ-পৃথিবীতে দীন কায়েম করেছেন কিন্তু তার পরবর্তীরা আর এই ধারা অব্যাহত রাখতে পারেনি। বরং তারা খেলাফত নিয়ে, ক্ষমতার দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়েছে। ভোগ-বিলাসিতায় মেতে উঠেছে। ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত করেছে।

দীন প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম, জেহাদ যখন জাতি ত্যাগ করল তখন সাধারণ মুসলিমগণ জান্নাতে যাবার জন্য, অধিক সওয়াব অর্জন করার জন্য নিরাপদ আমল খুঁজতে লাগলো। আর ধর্ম সম্পর্কে পণ্ডিত ব্যক্তিগণ ইসলামের বিধি-বিধানের চুলচেরা বিশ্লেষণ করতে লাগলেন। খুঁজে বের করতে লাগলেন কোন কাজে কত বেশি সওয়াব, কোন কাজের ধারেকাছে গেলেও সামান্যতম গোনাহের সম্ভাবনা আছে। জাতির মধ্যে জন্ম নিতে লাগল বিরাট বিরাট মুহাদ্দিস, মুফাসসির, ফকিহ, পীর, দরবেশ কিন্তু মহাবীর খালেদ, আলী, দেরার, মুসান্নাদের জন্ম হলো না আর। একেকজন ফকিহ একেক ধরনের মত দিয়ে, একেক জন পীর-দরবেশ একেক ধরনের তরিকা সৃষ্টি করে জাতিকে আদর্শিকভাবে বিভক্ত করতে লাগলেন। জাতি দুর্বল হতে লাগলো।

উমাইয়া খেলাফতের পতন ঘটিয়ে আব্বাসীয় খেলাফত এল ৭৫০ খ্রিষ্টাব্দে। উমাইয়া এবং আব্বাসীয়দের মধ্যে ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত হলো সাংঘাতিক রকম। আব্বাসীয় খেলাফতের সময়ে মুসলমানরা বিভিন্ন দিক থেকে বিরাট উন্নতি সাধন করল ঠিকই কিন্তু জাতিগতভাবে তারা একজাতি রইল না। শিয়া-সুন্নী, হানাফী, হাম্বলী, মালেকী, শাফেয়ী এমন অনেক আদর্শিক ভাগ তৈরি হলো উম্মাহর মধ্যে। যাইহোক, সময় আসলো আব্বাসীয় খেলাফতের পরিসমাপ্তির, আল্লাহর পক্ষ থেকে এই মুসলিম জাতির উপর গজব নাজিল হলো। সেই সময়ের ঘটনাটি জানতে পরবর্তী পর্বে চোখ রাখুন-