পৃথিবীর বর্তমান অবস্থা ও মানুষের প্রতিনিধিত্ব

প্রকাশিত: জানুয়ারী ৩১, ২০২১

পৃথিবীর বর্তমান অবস্থা ও মানুষের প্রতিনিধিত্ব
ভূতাত্ত্বিক বিজ্ঞানীদের মতে, পৃথিবী সৃষ্টির শুরু হয়েছে আনুমানিক ৪৫৫ কোটি বছর আগে আর পৃথিবীতে মানুষের উৎপত্তি হয়েছে আনুমানিক মাত্র ৩ লক্ষ বছর আগে। এই মধ্যবর্তী সময়ে পৃথিবী বিভিন্ন মহাবিপর্যয়ের মাধ্যমে ধীরে ধীরে মানুষের বসবাস উপযোগী হয়েছে। 

আল্লাহ পারতেন মানুষকেই এই দায়িত্ব দিতে যে, মানুষই এই বিপর্যয়ের মধ্যে থেকে পৃথিবীকে বসবাসের উপযোগী করে তুলুক। কিন্তু তিনি তা দেন নি। কারণ, তিনি জানেন এই দায়িত্ব মানুষকে দিলে মানুষ তা পারবে না। মানুষকে এমনভাবে সৃষ্টি করা হয়েছে, যা এই কাজের উপযোগী না।  তাই তিনি পৃথিবী ও মহাবিশ্ব সৃষ্টি করলেন নিজেই। তিনি বললেন, কুন (হয়ে যাও)। আর অমনিই সব হয়ে গেলো। আমাদের কাছে আশ্চর্য্য লাগতে পারে, যে পৃথিবী মানুষের উপযোগী হতে লাগলো ৪৫৫ কোটি বছর, সেখানে তিনি কুন বলেই হয়ে গেলো! হ্যা, কারণ আমরা এবং আমাদের অস্তিত্বের একক হচ্ছে সময়। আমাদের দৃশ্যমান সবকিছুই এই সময়ের ওপর নির্ভরশীল কিন্তু মহান আল্লাহ নন। তিনি সময়ের সীমায় আবদ্ধ নন, তিনি এসবের ঊর্ধ্বে। আমাদের কাছে যেটা কোটি কোটি বছর সেটা তাঁর কাছে এক পলকও না। 

ভূতাত্ত্বিক সময় সারণী
ভূতাত্ত্বিক সময় সারণী, উৎস: বাংলা উইকিমিডিয়া

আল্লাহ প্রয়োজনীয় সকল উপাদান, জীব-উদ্ভিদ দিয়ে সুশৃঙ্খল, নিরাপদ, পরিপূর্ণ ও ভারসাম্যপূর্ণভাবে সাজানো সুন্দর পৃথিবীটা (বলতে গেলে একটা জান্নাতের মতই) মানুষের হাতে 'আমানত' হিসেবে তুলে দিলেন এবং সাথে দিলেন আল্লাহর প্রতিনিধিত্বের দায়িত্ব। এই দায়িত্ব পাওয়ার কারণেই পৃথিবীর সকল সৃষ্টিকে আল্লাহ হুকুম দিলেন মানুষের সেবা (খেদমত) করার জন্য। আল্লাহ সকল মালায়েকদের বলেছিলেন আদম আ. কে  সাজদাহ (আনুগত্য) করার জন্য। ঐ সাজদাই হচ্ছে, এই সেবার প্রতিশ্রুতি, যেখানে ইবলিশ সাজদা করতে অস্বীকার করেছিলো এবং যুক্তি দিয়েছিলে মানুষ মাটির সৃষ্টি আর সে আগুনের, তাই মানুষের আনুগত্য সে করবে না। 

যাইহোক, সকল সৃষ্টির মধ্য থেকে মানুষকে আল্লাহ তাঁর খলিফা (প্রতিনিধি) নির্বাচন করলেন এবং পৃথিবীতে প্রেরণ করলেন। মানুষের জন্য এত বড় সম্মান অন্যান্য সৃষ্টির জন্য শুধু ঈর্ষণীয়ই নয়, অনেক মালায়েক নাকি ইচ্ছাপোষণ করেছেন মানুষ হয়ে জন্ম নেয়ার জন্য। 

মানুষ হাতে পেলো নিজেদের, পুরো পৃথিবী ও পৃথিবীর সকল সৃষ্টিকে শাসন করার অনুমোদন ও ক্ষমতা। কিন্তু আল্লাহ শর্ত দিলেন, পুরো শাসনব্যবস্থা পরিচালনার নীতি হবে আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত মৌলিক নীতিমালা (জীবনব্যবস্থা) অনুযায়ী। কারণ, মানুষ আল্লাহর প্রতিনিধি। আল্লাহ যেভাবে চাইবেন (অবশ্যই তিনিই সবচেয়ে ভালো জানেন, কোনটা উত্তম নীতি), সেভাবেই তাঁর হয়ে পরিচালনা করাই হলো আল্লাহর প্রতিনিধিত্ব (খেলাফাতি) করা। 

যেহেতু মানুষকে আল্লাহ সিদ্ধান্তগ্রহণ ও নির্বাহের জন্য 'স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি' দিয়েছেন, সেহেতু মানুষ এই পরিচালনার ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রিত (Programmatic, যেমন মালায়েকগণ) নয় যে, তাকে যাই করতে বলা হবে, তাই করবে এবং এর বাইরে যাবে না। আমরা ইতিহাসে এবং বর্তমানেও দেখতে পাই, মানুষ এই ক্ষমতার অপব্যবহার কতভাবে করছে এবং তার ফলাফল পৃথিবী ও পৃথিবীর সকল জীব-উদ্ভিদকূলের জন্য কত ভয়াবহ, ধ্বংসাত্মক। মালায়েকগণও আশঙ্কা করেছিলেন, মানুষ এই 'স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি' পাওয়ার কারণে পৃথিবীতে ফাসাদ (অন্যায়-অশান্তি) ও সাফাকুদ্দিমা (রক্তপাত, যুদ্ধ বিগ্রহ) করবে। [সূরা - বাকারা, আয়াত - ৩০ দ্রষ্টব্য] এই আশঙ্কার বিপরীতে আল্লাহ বলেছিলেন, তিনি যুগে যুগে প্রতি জনপদে তাঁর নবী-রসুল পাঠিয়ে হেদায়াহ (পথপ্রদর্শণ) ও দীন (জীবনব্যবস্থা) প্রেরণ করবেন।

পৃথিবীর বর্তমান অবস্থা ও মানুষের প্রতিনিধিত্ব


পৃথিবীতে মানুষের এই দীর্ঘসময়ের স্রোতে, মানুষ কখনো সেই পথে হেঁটেছে, কখনো অস্বীকার করেছে। মানুষের চিন্তাশক্তির বির্বতনের সাথে তার কৃতকর্মের প্রভাব পৃথিবী ও পৃথিবীর সকল সৃষ্টির ওপর পড়েছে। আজ আমরা এমন একটা সময়ে এসে পৌঁছেছি, যেখানে বিজ্ঞানী ও সচেতন মানুষেরা বর্তমান পৃথিবী ও পৃথিবীর জীব-উদ্ভিদ নিয়ে বড় উদ্বিগ্ন এবং ভয়াবহ কোনো বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছেন। আর এটার একমাত্র কারণ হচ্ছে মানুষ। মানুষ তার উদ্ধতপূর্ণ অহংকারে আস্ফালিত হয়ে এমন এক সভ্যতা সৃষ্টি করেছে যেটা প্রাকৃতিক নয়। কারণ, তা আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত মৌলিক নীতিমালা (জীবনব্যবস্থা) অনুযায়ী নয়। আর আল্লাহর জীবনব্যবস্থা ভারসাম্যপূর্ণ (Balanced)। 

আল্লাহ এই মানবজাতিকে অবশ্যই প্রশ্ন করবেন - তোমাদেরকে যে পৃথিবী আমি আমানতস্বরূপ দিয়েছিলাম, সেই পৃথিবী আমাকে ফিরিয়ে দাও।  পৃথিবী তো তোমাদের দেয়া হয়েছিলো আখেরাতের শস্যক্ষেত্র হিসেবে, কেমন সাজিয়েছো এই পৃথিবীকে? তোমার অবদান কতটুকু? কতটা দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়েছে? আমার প্রতিনিধিত্ব কেমন করেছো?

সেই প্রশ্নগুলোর উত্তরতো এই পৃথিবী ও পৃথিবীর মানুষসহ সকল জীব-উদ্ভিদকূলের দিকে তাকালেই স্পষ্ট বুঝা যায়। চারদিকে মানুষে মানুষে এত অন্যায়, অপকর্ম, অবিচার, অশান্তি; জলবায়ু ও পরিবেশকে মানুষ করেছে বিপর্যস্ত। মহাবিশ্বের সবচাইতে বসবাসযোগ্য গ্রহটি এখন হয়ে যাচ্ছে বসবাস অযোগ্য। সেই আমরাই আবার বসবাস অযোগ্য, নারকীয় আরেক মর্ত্য (জাহান্নাম) -এ যেতে চাই না, চাই আরেকটা প্রস্তুত (Completely Decorated) স্বর্গীয় পৃথিবী (জান্নাত)!