আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা: ভর্তিযুদ্ধ, র‌্যাগিং, বিশ্ববিদ্যালয় ও সার্টিফিকেট উপাখ্যান

প্রকাশিত: জানুয়ারী ২১, ২০২১

মস্তিষ্কের নিউরনের সর্বোচ্চ ব্যবহারে, অজানা শঙ্কার সর্বোচ্চ চূড়ায় পৌঁছে, পৃথিবীর তাবৎ চিন্তার বোঝা একটা মাথায় নিয়ে, কেবলমাত্র পারিবারিক ও শুভাকাঙ্খীর স্বপ্নপূরণের লক্ষ্যে দিনরাত অমানুষের মতো পরিশ্রম করে, অসম-বন্ধুর-কণ্টকময় প্রতিযোগিতায় টিকে থেকে নিজের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা আসন অর্জন করা কতটা যে কঠিন তা কেবল মাত্র ঐ ভুক্তভোগী ছাত্রটিই জানে ।

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা

যখন সে কাঙ্খিত অর্জন করে ফেলে তখনই সে তার সমসাময়িক হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম, অসীম শঙ্কা-ভয়-দুঃশ্চিন্তাকে অতীত ভাবতে শুরু করে এবং সব ঝেড়ে ফেলে হাঁফ ছেড়ে বাঁচে । নব উদ্যমে বাঁচতে শুরু করে, স্বপ্ন দেখে নতুন আগামীর । কিন্তু সে তো জানে না, সে কেবল প্রতিযোগিতার সিঁড়িতে পা রাখলো, তার জন্য উন্মোচিত হলো বিশাল প্রতিযোগিতার আসর! সে জানে না, কৃষকের স্বপ্নাতুর সন্তানকে নিয়ে এখন বিশ্ব তার মতো করে খেলবে, তার কাছে মজা লুটবে, প্রয়োজনে তার হাত-পা কেটে, রগ কেটে, চোখ উপড়ে নিয়ে ভৌতিক মঞ্চে তাকে ভূত সাজাবে! সেতো জানে না রাজনীতির ছেলেরা তার কাছে ফায়দা লুটবে, ক্ষমতাধরেরা তাদের ইচ্ছেমতো নাচাবে, । সেতো জানে না, ক্যাম্পাসের বড় ভাইয়েরা একটা রুমে তাকে নিয়ে গিয়ে সারারাত হৈ হুল্লোর করবে, শার্ট-স্যন্ডোগেঞ্জি খোলার পর প্যান্ট খুলতেও বাধ্য করবে, শালীন-অশালীন বাক্যে মানসিক ও শারীরিকভাবে যতোটা পারা যায় জর্জরিত করবে, দেশে এমনো কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে যেখানে প্রয়োজনে যৌনচারে বাধ্য করবে । যখন সে এমন পরিস্থিতির শিকার হবে, সবই দেখবে এবং হায়েনাদের দ্বারা শিকার হবে, তখন কিছুই করার নেই । জোরপূর্বক সম্মানগ্রহীতা বড় ভাই শ্রেণিটি হাতে খাবারের প্যাকেট ধরিয়ে দিয়ে কিংবা হোটেলে জোরপূর্বক ঢুকিয়ে তাদের দায়িত্ব শেষ করবে । এ যেনো সারারাতের পরিশ্রমের প্রাপ্যমূল্য! তখন ঐ ছাত্রটির কাছে যৌনপল্লীর পতিতাদের অবস্থান ভালো মনে হবে । কারণ, আর যাইহোক, অন্ততঃ পতিতারাতো ধর্ষনের শিকার হয় না । মানসিক ও শারীরিকভাবে কতটা নির্যাতিত হলে একটা ছাত্র নিজেকে ধর্ষিত ভাবতে পারে? সেই রাতটি ঐ ছাত্রটির জন্যে জীবনের অন্যতম কালো রাত । বালিশে মুখ গুঁজে ডুকরে ডুকরে কাঁদতে থাকে, হল কিংবা মেসের দেয়াল ভেঙ্গে শব্দেতর বীণার সুর ছেদিত হয়ে অজানায় যাত্রা করে । কান্নায় ভেসে আসে আপনজনের মুখ । তারা যদি তাদের সন্তানের এই অবস্থা দেখে, তবে কি সইতে পারবে? আদরের ছোট বোনটি অথবা ভাইটি যদি তার ভার্সিটি পড়ুয়া ভাই অথবা বোনের এমুহুর্তের ধর্ষিত মুখটি দেখে, তাদের অবস্থা কী হবে? চোখের জলের একেকটা ফোঁটার সাথে হৃদয় থেকে নির্গমন হয় একেকটা স্বপ্ন, যে স্বপ্নগুলো বাঁধতে সময় নিয়েছে দীর্ঘ তেরো থেকে চৌদ্দটা বছর । মাত্র একটা রাতই তাকে এতোটা ভেঙ্গে দিয়েছে! শিক্ষাসিরিজের গল্পগুলো এখানেই শেষ হলেও বেঁচে যেতো আগামী প্রজন্ম ও আমাদের ভবিষ্যৎ, কিন্তু চেইন অব সিস্টেমে আরো রয়েছে অনেকগুলো লেভেল । সেসব লেভেলে অন্তত ধর্ষিত হতে হয় না, তবে নিজেকে দিনে দিনে অপরাধী, অসহায়, পরিবারের উপর বোঝা ইত্যাদি মনে হয় । হয়তো সেই ধর্ষিত ছেলেটিও বছর যেতেই একরাতে কয়েকজন বন্ধুদের সাথে নিয়ে কোনো এক সদ্য চান্সপ্রাপ্ত ছাত্রকে বলবে, “বড় ভাইদের দেখলে সালাম দিস না কেনো? কান ধর! উঠবস কর! বুকডাউন দে! প্যান্ট খোল..!”

মনে আছে কি সেই ছাত্রটির কথা, যে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়েই চান্স পায় নি? তাদের কথা কি মনে আছে যারা কাঙ্খিত লক্ষ্য অর্জন করতে পারে নি? তারা অসমাপ্ত উপাখ্যানের চরিত্রে নিজেকে জড়িয়ে অনেকেই ব্যর্থ ভাবতে শুরু করে, সবার কাছে তখন খ্যাতি ছেলেটিও ঠুনকো মনে হয় । এসময় নিন্দুকেরা বেশ সুযোগ পেয়ে যায় । পরিবার-পরিজন আর শুভাকাঙ্খীরা নিথর হয়ে এক ব্যর্থ সৈনিকের নির্বাক ঠোঁট আর অপলক-লাজুক চোখের দিকে নির্লজ্জের মতো তাকিয়ে থাকে । ব্যর্থ সৈনিক শুধু নিজেকে নিজের মাঝে গুটাতে থাকে । গুটাতে থাকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে, কেউ কেউ চিরনিদ্রা পর্যন্ত । তবুও কেউ কেউ নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখতে শুরু করে । কিন্তু তাদের এ স্বপ্ন হোঁচট খায় কিছুদূর হেঁটে যাবার পর । প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্যে ব্যতিক্রম ব্যতীত প্রায় সবারই স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যায় । অবশ্য এই বৈষম্য বিশ্ববিদ্যালয়সহ সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পর্যায়েও রয়েছে । কে বলেছে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ধনী-গরীবের অন্ততপক্ষে শিক্ষাব্যবস্থায় কোনো বৈষম্য নেই! স্কুল-মাদ্রাসা, প্রাইভেট-পাবলিক, বাংলা-ইংরেজি মিডিয়াম, ক্যাডেট-ক্যান্টনমেন্ট, গভঃ উচ্চবিদ্যালয়-উচ্চবিদ্যালয, প্রাইমারী-কিন্ডারগার্ডেন এসব কী? এখানেই কি থেমে গেছে! দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ, যেখান থেকে আগামীর নেতৃত্বের কর্ণধারেরা বের হবে, সেই স্বায়ত্ত্বশাসিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর পরস্পর সাপে-নেউলে অবস্থান, সুযোগ-সুবিধাসহ সামগ্রিক ক্ষেত্রে পরস্পর বিপরীতমুখী ও বৈষম্যমূলক । চাকরির ক্ষেত্রেও স্বায়ত্ত্বশাসনের প্রভাব রয়েছে বটে । একই দেশের মাটিতে পড়ালেখা করে বৈষম্যমূলক আচরণের শিকার আমরা । গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে শিক্ষাব্যস্থায় এ কোন ধরণের গণতন্ত্রের ‍উদারতা, তা ভুক্তভোগীদের কাছে বড়ই রহস্যময়!

এতো গেলো প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থায় বৈষম্যের কিঞ্চিত কথা । আমরা একরকম ভুলেই গিয়েছি যে, একসময় এদেশের বড় বড় নাতুবাবু-ছাতুবাবুর ছেলেরা গুরুগৃহে কিংবা পাঠশালায় গিয়ে জ্ঞান অর্জন করতে যেতো । আর মেয়েরা অন্দরমহলে । তখনকার জ্ঞানার্জন আজকের মতো আধুনিকায়ন না হওয়ায় তা সার্টিফিকেটে সীমাবদ্ধ ছিলো না! তাই তখনকার শিক্ষাব্যবস্থায় যে যতো বড় জ্ঞানী ছিলো, তার অহংকার ততোই কম ছিলো, উদারতা ছিলো ততই বেশি । ‘শিক্ষিত হয়ে মানুষের মতো মানুষ হওয়া’ কথাটি তখনকার দিনের জন্য প্রযোজ্য । অথচ মূর্খতার কারণে আমরা তা আজকের দিনেও অপপ্রয়োগ করছি ।

বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় যে ছাত্র পরীক্ষার খাতায় ‘শ্রমের মর্যাদা’ রচনা লিখতে গিয়ে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা কাগজ ফুরায়, সেই কিনা স্নাতক-স্নাতকোত্তর শেষ করার পর শিক্ষিত কৃষক হতে লজ্জা পায়, হকারি করতে লজ্জা পায়, কম মাইনের কাজ করতে লজ্জা পায়, ওয়ার্কশপের কালি তার কাছে তখন ঘৃণার বস্তু হয়, কলকারখানার ধোঁয়া তার কাছে মান হানিকরের বিষয়! অদ্ভূতের বিষয় নয় এটা । আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এরচেয়ে বেশি শেখাতে পারেনি আমাদেরকে । বড় বড় ডিগ্রীর চাপায় তখন প্লেটো-এরিস্টটল, ইউক্লিড, পীথাগোরাসের শিক্ষা হারিয়ে যায় । সার্টিফিকেটের ঔদ্ধতায় হারিয়ে যায় ডঃ লুতফর রহমানের উন্নতজীবন, মহৎজীবনের শিক্ষা, তলিয়ে যায় সিস্টেমের অথৈ সাগরে । তাই দোষ কোনো ছাত্রের নেই, দোষ নেই কোনো শিক্ষকের । কারণ আজকের ছাত্রইতো আগামী দিনের শিক্ষক । এ শিক্ষাব্যবস্থায় থেকে যা হয়েছে তা হলো, কাগজে-কলমে এক রূপ আর বাস্তবিক ক্ষেত্রে তার বিপরীত রূপ ।

তাহলে এই পরস্পর বিরোধী ও প্রতারণাময় শিক্ষাব্যবস্থার কাছে আমরা কেনো সোনার ছেলেমেয়েদের আশা করি? সার্বিক চিন্তাসাপেক্ষে তাদের উপর কি এটা জুলুম নয়? আর যারা মনে করছেন প্রতিবছর দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে সোনার ছেলেমেয়েরা বের হচ্ছে, তারা বিবেকের কষ্টিপাথর দিয়ে কি ঘঁষে দেখেছেন আসলে সোনার না সেমিগোল্ড? এখনো সময় আছে ভয়ংকর প্রতারণাময় শিক্ষাব্যবস্থা থেকে আগামী প্রজন্মকে বাঁচানোর । নতুবা খুব বেশিদূর নয়, যেদিন চতুষ্পদ প্রাণীগুলোও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিড় জমাবে একটা ডিগ্রী নেয়ার জন্য, যেদিন বিশ্বখ্যাত এনকাউন্টার-টেরোরিস্ট তৈরি করার জন্য বিভিন্ন কোর্স চালু হবে প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে, যেদিন কেবলমাত্র শিক্ষিত হওয়ার কারণে দেশে সৃষ্টি হবে আরেকটা ‘ছিয়াত্তরের মন্বন্তর’!

[লেখাটি ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে লেখা]