কোরআন আসলে কী?

প্রকাশিত: জানুয়ারী ০২, ২০২১

কোরানে ইতিহাস আছে, তার মানে এই নয় যে কোরান কোন ইতিহাস গ্রন্থ। কোরানে বিজ্ঞান আছে, কিন্তু তার মানে এই নয় যে কোরান বিজ্ঞানের বই। কোরানে ব্যবসায়িক নীতি আছে, তার মানে কোরান কোন ব্যবসা-বাণিজ্যের বই নয়। কোরানে আত্মিক উন্নতির কথা আছে, তার মানে এই নয় যে কোরান শুধু আত্মিক উন্নতির বই। কোরানে দণ্ডবিধি আছে, তার মানে এই নয় যে কোরান দণ্ডবিধির বই।

শেষ বিষয়টা নিয়ে অনেকের সন্দেহ থাকতে পারে। তাই এটার একটা ব্যাখ্যা দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা বোধ করছি। কোরান ঘেঁটে দেখবেন কোরানে দণ্ডবিধি তেমন একটা নেই। চুরি করলে কি শাস্তি হবে, জিনা-ব্যভিচারের কি দণ্ড হবে, হত্যার বদলে কি শাস্তি হবে, সন্ত্রাস সৃষ্টি করার কি শাস্তি হবে মোটামোটি এই কয়েকটা দণ্ড দেওয়া আছে। সব অপরাধের দণ্ড সেখানে নেই।

কোরআন আসলে কী

তার মানে দাঁড়াচ্ছে কোরান পুরোপুরি ইতিহাসের বই নয়, বিজ্ঞানের বই নয়, ব্যবসা-বাণ্যিজের বই নয়, আইনের বইও নয়। তাহলে কোরান কী? কোরান হচ্ছে একটা গাইড লাইন। হুদাল্লিল মুত্তাকিন- মুত্তাকীদের জন্য গাইড লাইন। কিসের গাইড লাইন? কোন মানদণ্ড দিয়ে বিজ্ঞান চলবে, কোন মানদণ্ড দিয়ে আইন চলবে, কোন আইনে ব্যবসা চলবে, কোন নিয়মে বিচার চলবে তার গাইড লাইন। ধরুন, কোরানে আছে চুরি করলে শাস্তি হচ্ছে হাত কাটা। এখন একজন সামান্য একটা কলম চুরি করল আর অন্য একজন আটশ কোটি টাকা চুরি করল। তাদের দুজনেরই কি হাত কাটা যৌক্তিক? নিশ্চয় আটশ কোটি টাকা চুরি করা ব্যক্তির হাত কাটার সমান শাস্তি একজন কলম চোরের উপরে চাপিয়ে দিলে সেটা তার উপর জুলুম হয়ে যাবে! সন্দেশ আর গুড়ের মূল্যায়ন এক হয়ে যাবে!!

তাহলে এক্ষেত্রে করণীয় কী? এক্ষেত্রে করণীয় হচ্ছে আল্লাহর কথা স্মরণ রেখে কলম চোরকে তার অপরাধ অনুযায়ী শাস্তি প্রদান করা অথবা জরিমানা করা। সেটার ফয়সালা যিনি দিবেন তিনি সমস্ত দায়ভার নিয়ে তার জন্য যা উপযুক্ত তা দিবেন। এটাই হচ্ছে আদল। তিনি মন থেকে সৎ থাকবেন। অর্থাৎ তিনি সর্বদা স্রষ্টার কথাকে মাথায় রেখে রায় প্রদান করবেন। এ জন্যই বিচারকদের দায়িত্ব অনেক বেশি। তারা একদিকে যেমন সর্বোত্তম মর্যাদা পাবেন তেমনি হেরফের করলে তারাই বড় জালেম হয়ে যেতে পারেন।

এখন কাকে কি শাস্তি দেওয়া হবে সেটা কনস্ট্যান্ট নয়। একই অপরাধের দায়ে পরিবেশ-পরিস্থিতি বিবেচনা করে একেকজনকে একেক দণ্ড প্রদান করা হতে পারে। এই বিচারের দায়িত্ব একান্তই কাজীর (বিচারকের) উপর নির্ভর করবে। তিনি সৎ থাকলেই সব ঠিক।

প্রশ্ন হচ্ছে গুটিকয়েক দণ্ড কোরানে থাকার পরেও একজন ফকিহ কিভাবে ৮৩ হাজার মাসলা তৈরি করলেন? এভাবে আরো শত শত ফকিহদের মাসলার পরিমাণ যোগ করলে সেটা কী আকার ধারণ করেছে সেটা কল্পনা করা যায়? মনে রাখতে হবে ঐ মাসলা-মাসায়েলগুলো কিন্তু ঐ সময়ের পরিবেশ-পরিস্থিতি অনুযায়ী তৈরি করা হয়েছিল কোরান ও সুন্নাহকে গাইড লাইন ধরে। তাও সবার ক্ষেত্রে ওগুলো প্রয়োগ যোগ্য ছিল না। তাই ওগুলো সর্বযুগের জন্য কনষ্ট্যান্ট নয়। আসলে সকলের জন্য আলাদা আলাদা মাসলা নির্ধারণ করা ঠিকও নয়।

কোরান -সুন্নাহকে মানদণ্ড ধরে মাসলা নির্ধারণ করা সমসাময়িক কাজীর বিষয়। পূর্বে কাকে কোন অপরাধের জন্য কী শাস্তি দেওয়া হয়েছিল বা কী রায় দেওয়া হয়েছিল সেটা নিয়ে গবেষণা করার কাজ ঐ বর্তমানের কাজীরই। যে কাজী নয় তার জন্য ওগুলো গুরুত্বপূর্ণ নয়। যেমন গুরুত্বপূর্ণ নয় একজন সাধারণ মানুষের আইন শাস্ত্র পড়া। ওটা নির্দিষ্ট লেভেলের লোক অর্থাৎ যারা ভবিষ্যতে আইনের প্র্যাক্টিস করবে তাদের বিষয়।

কথা হচ্ছে, বর্তমানে আমরা যাদেরকে আদালতে রায় দিতে দেখি তারা কি ন্যায় বিচার করেন না? তারা কি যুক্তি, ন্যায়-নীতি, পরিবেশ-পরিস্থিতি অনুযায়ী সঠিক রায় দেন না? হ্যাঁ, দেন। তবে তাদেরকে আল্লাহর ভাষ্য সুরা মায়েদার ৪৪,৪৫,৪৭ নং আয়াতের ভিত্তিতে কেন কাফের মনে করা হয়? এর একমাত্র কারণ হচ্ছে ঐ বিচারকরা আল্লাহকে সার্বভৌমত্বের মালিক মনে করে রায় প্রদান করেন না। তারা স্রষ্টার দেওয়া গাইড লাইনকে মাথায় রেখে বিচার প্রদান করেন না। আর সবই ঠিক আছে। তারাও হত্যার পরিবর্তে ফাসিঁর রায় দেন (হত্যার পরিবর্তে হত্যা), চুরির অপরাধে জেলে পাঠান, সন্ত্রাসের অপরাধে উপযুক্ত কোন দণ্ড প্রদান করেন। তারা যদি এই ন্যায় বিচারটাই শুধু স্রষ্টার কথা মাথায় রেখে প্রদান করেন, স্রষ্টাকে গাইড লাইন হিসেবে ধরে নিয়ে রায় দেন তবেই ষোলো কলা পূর্ণ হয়ে যায়।

বিষয়টা হচ্ছে এমন- ধরুন আপনি বিয়ে বহির্ভূতভাবে একজন নারী বা পুরুষের সাথে যৌনমিলন করলেন। আপনি ব্যভিচার করলেন। এটা সাংঘাতিক অপরাধ। অপরদিকে আপনি যদি একই কাজ বিয়ে করার পর করেন তবে এতে আপনার দোষ নেই। কাজ একই অথচ এ দুটোকে গ্রহণ করা হচ্ছে একেবারে বিপরীতভাবে, কারণটা কী? কারণ হচ্ছে স্বীকৃতি। স্রষ্টার স্বীকৃতি। আপনি বিচার করছেন স্রষ্টার গাইড লাইনকে মাথায় রেখে, আপনি ব্যবসা করছেন স্রষ্টার কথাকে মাথায় রেখে, আপনি সম্পর্ক ও শত্রুতা করছেন স্রষ্টার গাইড লাইনকে স্মরণে রেখে, আপনি যৌনমিলন করছেন স্রষ্টার গাইড লাইনকে স্মরণে রেখে- That's all are Ok. এটা করলে আপনার সব কাজ এবাদত বলে গণ্য হবে। যেই আপনি ঐ গাইড লাইন ভুলে গেলেন সেই আপনি সবকিছুকে বরবাদ করে দিলেন। সব অবৈধ হয়ে গেল।

রাষ্ট্র ইসলামকে ধর্ম হিসেবে গ্রহণ করেছে। এখন সৃষ্টিকর্তার আদেশ-নিষেধকে গাইড লাইন ধরে, সৃষ্টিকর্তার গাইড লাইনকে মানদণ্ড ধরে বিচার করুক, দণ্ড দিক, ব্যবসা করুক, আইন রচনা করুক, জনকল্যাণের কাজ করুক তবেই সব ঠিক হয়ে যাবে। এ জন্য আহামরি কিছু করতে হবে না। শুধু স্রষ্টার দেওয়া মানদণ্ডটাকে গ্রহণ করলেই হয়। এটুকু করলে দৃশ্যমান পরিবর্তন তেমন কিছু হবে না। কিন্তু ভিতরে ভিতরে আমূল পরিবর্তন এসে যাবে।