অতিশাসন এবং অতি আদর

প্রকাশিত: মার্চ ১১, ২০২১

সন্তান বা ছাত্রকে কখন, কিভাবে, কেন, কতটুকুন শাসন করতে হবে এটা না জানার কারণে দেখা গেছে অতি আদরে এবং অতিশাসনে সন্তান বা ছাত্র নষ্ট হয়ে গেছে। 

অতিশাসন এবং অতি আদর
আমি যেহেতু মাদ্রাসায় পড়িনাই, আমার নিজস্ব অভিজ্ঞতা নাই। কিন্তু আমার খালাতো ভাইকে নিজের চোখে দেখেছি কিভাবে মাদ্রাসার অতি শাসনে নষ্ট হয়ে গেছে। হ্যা, সব মাদ্রাসাই এরকম না। এই অতিশাসন, বর্বরতা শুধু মাদ্রাসাতেই নেই, একসময় স্কুলেও ছিলো। স্কুলপড়ুয়া সহপাঠীকে দেখেছি কিভাবে শিক্ষকের অতিশাসনে নষ্ট হয়ে যেতে। প্রাইমারিতে আমার অনেক সহপাঠী স্কুল থেকে ঝড়ে পড়েছে শুধু এই কারণে। একদিন পড়া না পারা কারণে আমাদের যে বেত্রাঘাত করা হয়েছিলো, সেকারণে রাত থেকে আমাদের সবার জ্বর এসেছিলো। পরের দিন সকালে উঠে দেখি হাতে কালোদাগ হয়ে গেছে। এখন ঐ বেত্রাঘাতের কথা চিন্তা করি। কোনো প্রয়োজনই ছিলো না ঐরকম বেত্রাঘাতের। আসলে পড়াটা আমরা পারতাম কিন্তু লাঠিহাতে স্যারের রাগান্বিত চেহারা দেখে প্রথম সারির ছাত্ররা পর্যন্ত পড়া দিতে পারেনি। ঐ স্যারের কঠোরতার কারণে অনেকেই স্কুল পরিবর্তন করেছিলো। 

এবার আসেন অতি আদরের ব্যাপারে। নিজের চোখে দেখেছি সন্তান চাইতে না চাইতেই বাবা-মা এটা কিনে দেয়, ওটা কিনে দেয়। শাসনের বালাই ছিলো না। এই ছেলেগুলো আমার স্কুলকলেজের সহপাঠী ছিলো, তাদের কেউ কেউ আবার আমার সহপাঠীর সহাপাঠী। যাইহোক, তাদের অনেকেই শহরের নামি-দামি স্কুলের ছাত্র ছিলো। অথচ কলেজ পেরিয়ে তাদের অনেকেই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে পা রাখতে পারেনি। অধিকাংশই মাদকাসক্ত। এমনকি মা-বাবার গায়ে হাত তোলে! 

তাই অভিভাবক এবং শিক্ষকদের এই শিক্ষাটা স্পষ্ট মাথায় রাখতে হবে, আমার সন্তানটাকে কখন, কিভাবে, কেন, কতটুকুন শাসন করতে হবে। শাসন করার আগে এটাও নিশ্চিত হতে হবে আমি ঐ সন্তানটাকে কতটুকুন স্নেহ-ভালোবাসা দিয়েছি। আমি যদি স্নেহ-ভালোবাসা না দিয়ে থাকি আমি বড়জোর তাকে বলতে পারি, এটা ঠিক না, ওটা ঠিক না কিন্তু শাসনের অধিকার আমার নাই। শাসনের অধিকার তারই আছে, যে ভালোবেসেছে। 

যে শাসনে শাসকের হৃদয়ে কষ্টের সৃষ্টি করে না, সেটা শাসন নয়; হিংস্রতা কখনো কখনো জিঘাংসা! এই হিংস্রতা যদি কোনো শিক্ষক করে থাকেন, আপনি প্রয়োজনে শিক্ষক পরিবর্তন করুন, সম্ভব না হলে কড়া নির্দেশ দিবেন যাতে পরবর্তীতে এরকম না করে। কিন্তু শিক্ষকের শাসন বলে সেই হিংস্রতাকে প্রশ্রয় দিয়ে যদি ভাবেন আপনার সন্তানকে মানুষ করার জন্য মহান কাজ করছেন, তাহলে আপনি ভুল করছেন, বড় ভুল। এটা সন্তানের ভিতর নেতিবাচকভাবে জেদ তৈরি করবে, তার চিন্তাভাবনায় বিভিন্ন দ্বিধা-দ্বন্দ্বের সৃষ্টি করবে। আরো অনেক খারাপ কিছুই ঘটতে পারে। 

আমার ব্যক্তিগত মত হলো দেশের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সীমিত পরিসরে শাসনের ব্যবস্থাটা রাখা হোক, কিন্তু তার আগে স্কুল-মাদ্রাসাসহ সকল শিক্ষকদের প্রশিক্ষিত করা হোক। কারণ, শিক্ষকদের দায়িত্ব শুধু ছাত্র পেটানো কিংবা শুধু ছাত্র পড়ানো নয়, বরং শিক্ষকের আসল দায়িত্ব হলো ছাত্রকে মানুষ করা, সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা।