ইসলামে বীরাঙ্গনা নারীদের ইতিহাস

প্রকাশিত: এপ্রিল ২৬, ২০২১
ইসলামে বীরাঙ্গনা নারীদের ইতিহাস
"যে জাতি তার ইতিহাস জানে না। সে জাতি তার ইতিহাস নির্মাণ করতে পারেনা । " - জগদীশচন্দ্র রায় ।
মানবজাতি আল্লাহর খলিফা বা প্রতিনিধি । এই প্রতিনিধির মধ্যে  নারী ও পুরুষ উভয়েই অন্তর্ভুক্ত। 

জান্নাতের অঢেল সুখ-শান্তি বাবা আদমকে পরিপূর্ণতা দিতে পারেনি । কারণ  মা হাওয়া ছিলেন না ।   মা হাওয়াকে পেয়ে বাবা আদম পরিপূর্ণতা পেলেন ।  জান্নাতের  অঢেল সুখ-শান্তি তখন স্বার্থক মনে হলো । 

আজ আমরা এই নারী সম্পর্কে এমন ধারণা পোষন করি যা নারী জাতির প্রতি অবমাননা বৈ  অন্য কিছু নয় । 

ভূমিকা না বাড়িয়ে  মূলকথায় যেতে চাচ্ছি । 

শতশত বছর থেকে  বিভিন্ন মাধ্যমে নারী সম্পর্কে আমরা এমন ধারণা পেয়ে আসছি যা আমাদের চিন্তা-চেতনাকে অবস করে দিয়েছে । 

আমরা এগুতে পারছি  না । এখন মানবজাতির এই সংকটময় মুহূর্তে  কী করণীয় তা জানতে  ফিরে যাবো মানবজাতির সর্বশ্রেষ্ঠ মানব, উসওয়াতুল হাসানাহ বা সর্বোত্তম আদর্শ বিশ্বনবী, রাহমাতাল্লিল আলামীন হযরত মুহাম্মদ (সা) এর জীবনীতে। তিনি আমাদের জন্য কোন শিক্ষা রেখে গেলেন তা  জানবো  ইনশাআল্লাহ । 

রাসূলাল্লাহ (সা) নুবওয়াত পূর্ব থেকেই বিপ্লবী ছিলেন ।  সমাজ পরিবর্তনের একটা  ব্যাকুলতা সর্বদাই তাঁকে ভাবিয়ে তুলতো । সেই ব্যাকুলতা থেকেই হিলফুল ফুজুল বা শান্তি সংঘ গড়ে তুললেন ।  কিন্তু লক্ষ্য অর্জন করতে পারলেন না । কারণ তা ছিল তাঁর নিজস্ব বুদ্ধিবৃত্তিক প্রক্রিয়া । 

আল্লাহ তাঁকে আসল পথ দেখালেন ।  

আল্লাহ বলেন , 

"তিনি আপনাকে পেয়েছেন পথহারা , অতঃপর পথপ্রদর্শন করেছেন।" (সূরা আদ-দুহাঃ ০৭) 

শুরু হলো সমাজ পরিবর্তনের কাজ । সেই কাজে সর্বপ্রথম যিনি রাসূলাল্লাহর সাথে অংশগ্রহণ করলেন এবং পূর্ব থেকেই রাসূলাল্লাহকে সর্বদা দেখভাল করে রেখেছেন তিনি একজন নারী ।  আম্মা খাদিজা রা.। 

ইসলামের ১ম শহীদও একজন নারী। সুমাইয়া রা.।  

ইসলামের যুদ্ধগুলোতেও ছিল নারীদের অংশগ্রহণ ।  পর্দার বিধানের আগে কি পরে সর্বদাই । 

তেমনি কিছু সৌভাগ্যবান মহীয়সী নারী হলেন উম্মে আম্মারা রা., হযরত উম্মে হুকাইম রা. , হযরত আসমা বিনতে ইয়াজীদ   রা., উম্মে হারেস  রা. ,  উম্মে সুলাইম হাবীব ইবনে সালমা   রা., উম্মে আতীয়া রা., নবী দুহিতা হযরত ফাতিমা রা., হযরত আয়েশা রা., হুমনা বিনতে জাহাশ রা., উম্মে আয়মান রা., রুফায়দাহ রা. আরও নাম না জানা অসংখ্য নারী। 

সেইসব বীরাঙ্গনা নারীরা নিজেদের হাতে অস্ত্র ধারণ করতেন। পুরুষদেরকে অস্ত্রধারণের জন্য সাহস ও হিম্মত যুগিয়েছেন ।  জিহাদে আহত লােকদের সেবা - শুশ্রুষা করেছেন । মুজাহিদরা যুদ্ধ করতে করতে পড়ে গেলে তাদের তুলে নেয়ার কাজ করেছেন। তাদের জন্যে খাবার তৈরী করে পৌছে দিতেন। তাঁরা ক্লান্ত  হয়ে পড়লে মহিলারা তাদের জন্যে বিশ্রামের ব্যবস্থা করতেন । পিপাসায় কাতর হয়ে পড়লে মহিলারা তাঁদের পানি পান করাতেন । 

নবী করীম সা. -এর নেতৃত্বে ছয়টি যুদ্ধে যােগদানকারী একজন মহিলা সাহাবী বলেছেনঃ  আমরা আহতদের জখমের ওপর ব্যাণ্ডেজ করতাম এবং রােগাক্রান্তদের চিকিৎসা বা সেবা - শুশ্রুষা করতাম । 

উম্মে আতীয়া রা. নামক এক মহিলা সাহাবী  বলেনঃ " আমি মুজাহিদদের জিনিস পত্রের রক্ষণাবেক্ষণ করতাম । তাদের জন্যে খাবার তৈরী করতাম , আহতদের ও রােগাক্রান্তদের সেবাশুশ্রুষা করতাম । " -মুসলিম , মুসনাদে আহমাদ । 

উম্মে আম্মারা রা.  সম্পর্কে ইতিহাসে এরকম বর্ণনা পাওয়া যায়, 

উম্মে আম্মারা রা. ছিলেন একজন মহিলা সাহাবী । ওহােদের যুদ্ধে যােগদান করে তিনি পুরুষদের মতই অতুলনীয় বীরত্ব , দুর্দমনীয় সাহসিকতা ও অসাধারণ দৃঢ়তা প্রদর্শন করতে সক্ষম হয়েছিলেন । তিনি ভােরবেলা শয্যা ত্যাগ করে উঠে যেতেন এবং মুজাহিদদের খেদমত করার উদ্দেশ্যে সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত হতেন ।

উহুদের যুদ্ধের ২য় ধাপে যখন রাসূলাল্লাহ আক্রান্ত হলেন সে সময় তিনি রাসূলে করীম ( সা )  এর নিকট উপস্থিত হয়ে তাঁকে রক্ষার উদ্দেশ্যে তীর ও তরবারি চালাতে শুরু করে দিলেন । এই সময় শত্রুপক্ষের নিক্ষিপ্ত তীর ,  বল্লমের আঘাতে তাঁর দেহ ক্ষতবিক্ষত হয়ে যায় । 

স্বয়ং নবী করীম ( সা ) তাঁর এই বীরত্বপূর্ণ যুদ্ধের কথা উল্লেখ করেছেন । 

রাসূলাল্লাহ বলেন ,  আমি ডানে ও বামে তাকিয়ে দেখেছি উম্মে আম্মারা রা. আমাকে রক্ষা করার জন্যে প্রবল বিক্রমে যুদ্ধ করছে ।

উম্মে আম্মারার পুত্রকে আহত করেছিল যে ব্যক্তি , তাকে সামনে পেয়ে তিনি তার উপর ঝাপিয়ে পড়েছিলেন এবং ক্রমাগত তীর নিক্ষেপ করে  প্রতিশােধ নিয়েছিলেন ।

একজন  অশ্বারােহী শত্রুসৈন্য তাঁর ওপর আক্রমণ চালালে তিনি ঢালের আড়ালে আত্মরক্ষা করেন এবং শত্রুসৈন্যটির ফিরে যাওয়ার সময় তার ঘোড়ার পা কেটে দেন । এই সময় তাঁর পুত্র মায়ের সাহায্যে এগিয়ে আসে এবং মা ও পুত্র মিলে শত্রুকে পরাজিত করেন । 

নবী করীম সা. নিজে এই দৃশ্য অবলােকন করে স্বতঃস্ফূর্তভাবে বলে উঠলেনঃ " আজ উম্মে আম্মারা তুলনাহীন সাহসিকতা ও দৃঢ়তা প্রদর্শন করেছেন ।

ওহােদ ছাড়াও খায়বর , হুনাইন ও ইয়ামামার যুদ্ধেও তিনি যােগদান করেছিলেন । ইয়ামামার যুদ্ধে লড়াই করতে করতে তাঁর হাতখানাই শহীদ হয়ে যায় ।

এছাড়া তাঁর সর্বাঙ্গে বহুসংখ্যক ক্ষতও দেখা দিয়েছিল ।  - তাবাকাতে ইবনে সায়াদ

ইকরামা বিন আবু জেহেলের স্ত্রী হযরত উম্মে হুকাইম রা. রোমানদের সাথে মুসলমানদের যুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন । 

আজনাদিনের যুদ্ধে  ইকরামা শহীদ হওয়ার  কিছুদিন পর হযরত খালিদ ইবনে সায়ীদের রা. সাথে তাঁর পূনর্বিবাহ অনুষ্ঠিত হয় । কিন্তু ফুলশয্যার রাত্রেই রােমানরা আক্রমন করলে উম্মে হুকাইম রা. প্রতিরক্ষা যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়েন এবং সাতজন শত্রুকে খতম করেন ।  - আল  ইস্তীয়াব ।

ইয়ারমুক যুদ্ধে হযরত আসমা বিনতে ইয়াজীদ নাম্নী মহিলা সাহাবীর হাতে নয়জন রােমান সৈন্য নিহত হয় । - আল - ইসাবা । 

হুনাইনের যুদ্ধে  মুসলিম বাহিনী যখন যুদ্ধক্ষেত্র ত্যাগ করছিলেন , তখন উম্মে হারেস নাম্নী  আনসার বংশের একজন মহিলা সাহাবী অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে  পর্বতের মত অবিচল থেকে যুদ্ধ  করছিলেন  । 

হযরত আনাসের রা. জননী উম্মে সুলাইম ওহােদ ও হুনাইনের যুদ্ধে সশস্ত্র হয়ে যুদ্ধ করেন ।

ওহােদের যুদ্ধে বহুসংখ্যক সাহাবী আহত হয়ে পড়েছিলেন । তাঁদের খেদমতের জন্য মদীনা থেকে বহুসংখ্যক মহিলা সাহাবী ওহােদ যুদ্ধক্ষেত্রে গমন করেন।

নবী দুহিতা হযরত ফাতিমা রা. ও এব্যাপারে পিছিয়ে থাকেন নি । - ফতহুল বারী

নারী আসহাবদের তৎপরতা এতো বেগবান ছিল  যে , তাদের দ্রুত চলাচলের ফলে তাঁদের দেহে পরিহিত অলঙ্কার পর্যন্ত দেখা যেত । তাঁরা পানির পাত্র পিঠের ওপর তুলে বহন করে আনতেন এবং  তা পান করাতেন । এ ধরনের কাজ তাঁরা বার বার করেছেন ।

হযরত উমর রা. বলেছেনঃ উম্মে সুলাইম রা. ওহোদের দিন আমাদের জন্যে পাত্র ভরে পানি নিয়ে আসতেন ।

হুমনা বিনতে জাহাশও রা. এ কাজ করেছেন সেদিন । তিনি তৃষ্ণার্তকে পানি পান করিয়েছেন এবং আহতদের চিকিৎসা ও সেবা - শুশ্রুষা করেছেন । এঁদের সঙ্গে শরীক ছিলেন উম্মে আয়মান নাম্নী অপর এক মহিলা সাহাবী ।

উম্মে আম্মারা নাম্নী মহিলা সাহাবী সকাল বেলাই আহতদের সেবা - শুশ্রুষা ও প্রাথমিক চিকিৎসার জন্যে জরুরী জিনিসপত্র সঙ্গে নিয়ে ওহােদের যুদ্ধক্ষেত্রে চলে গিয়েছিলেন ।

ঐতিহাসিক ইবনে ইসহাক বলেন ,  খায়বরের যুদ্ধে নবী করীমের (সা) সঙ্গে বিপুল সংখ্যক  নারী  মহিলা সাহাবী যােগদান করেছিলেন । 

হাশর ইবনে জিয়াদের দাদী , আম্মা এবং আরও পাঁচজন মহিলাও এই যুদ্ধে যােগদান করেন ।

তাঁরা কি জন্যে এসেছেন জিজ্ঞেস করা হলে তাঁরা বললেনঃ হে রাসূল ! আমরা এসেছি এই উদ্দেশ্য নিয়ে যে ,আমরা কবিতা পাঠ করব এবং এর সাহায্যে আমরা আল্লাহর পথে জিহাদের প্রেরণা যুগিয়ে সাহায্য করব । আমাদের সঙ্গে আহতদের চিকিৎসার ঔষধপত্র রয়েছে । তীর নিক্ষেপকারীদের হাতে আমরা তীর পরিবেশন করব এবং প্রয়ােজন হলে ক্ষুধার্তদের ছাতু বানিয়ে খাওয়াব ।

খায়বার যুদ্ধ যাত্রাকালে গিফার গােত্রের কয়েকজন মহিলা উপস্থিত হয়ে নিবেদন করলেনঃ হে আল্লাহর  রাসূল ! আমরাও আপনার সঙ্গে যুদ্ধে গমন করার উদ্দেশ্যে হাজির হয়েছি । আমরা সেখানে আহতদের ঔষধপত্র দিয়ে সেবা - শুশ্রুষা করব এবং মুজাহিদদের যতটা সম্ভব সাহায্য করব । 

ইবনে আবদুল বার নবী করীমের ( সা )  ফুফু ও আবদুল মুত্তালিব দুহিতা আরওয়া সম্পর্কে লিখেছেনঃ  ঈমান গ্রহণের পর তিনি সর্বশক্তি দিয়ে নবীজীর সা.  সাহায্য - সহায়তা করতেন এবং তাঁর পুত্রকে নবী করীম সা.  এর সাহায্যে ঝাঁপিয়ে পড়া ও তার লক্ষ্যকে নিজের জীবন - লক্ষ্যরূপে গ্রহণ করে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে যাওয়ার জন্যে বরাবর উৎসাহিত করছিলেন । 

হযরত তুলাইব  রা.  কে নির্যাতন করার সংবাদ কাফেররা তাঁর মাকে দিলে প্রতিত্তোরে  তাঁর মা বলেন,

তুলাইব যেদিন তার মামাতাে ভাইয়ের ( রাসূলাল্লাহ)  সমর্থনে দৃঢ়তার সাথে দাঁড়িয়ে যাবে , সেই দিনটিই হবে তার সবচাইতে  ও কল্যাণময় দিন । কেননা তার মামার এই ছেলেটি আল্লাহর নিকট থেকে প্রকৃত সত্য দ্বীন নিয়ে এসেছেন । 

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যায়েদ রা. ওহােদের যুদ্ধে আহত হলে তার জননী তার সেবা - শুশ্রুষা করলেন এবং বললেনঃ 'হে পুত্র ! ওঠো এবং তরবারি নিয়ে এই মোশরেকদের  ওপর ঝাঁপিয়ে পড় । 

আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দা বিনতে উতবা ওহােদ যুদ্ধে মুসলিম শহীদদের বিরুদ্ধে কবিতা পাঠ করে কুৎসা রটাতে শুরু করলে হযরত আসমার রা. কন্যা হিন্দার কবিতার ভাষায়ই তার কঠোর জবাব দেন । - ইবনে হিশাম। 

আজ আমরা ওয়াজে আওয়াজে নারীদের ব্যাপারে যা শুনি তাতে  আমাদের মন থেকে সেই আওয়াজের প্রভাব দূর করতে  কিছুটা সময় লাগবে । 

প্রকৃত ইসলামের নারীরা যদি যায় উত্তর দিক তবে প্রচলিত ইসলামের নারীরা যাবে দক্ষিণ দিক । 

আমাদের নারীদেরকে আজ এই ইতিহাস জানতে  হবে ।  যদি না জানেন তবে  যে সন্তান  পরম মমতায়  বুকে আগলে রাখছেন আজ সেই সন্তানকে কেঁড়ে নিয়ে চোখের সামনে হত্যা করবে কাল ।  

কোলের শিশুকে গাছের সাথে  আছাড় দিয়ে  মারার নির্মম ইতিহাসের   সাক্ষী আছে আমাদের পূর্বপুরুষগন  ।  সেই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি যাতে না ঘটে সে জন্য  এখনই অতীত থেকে শিক্ষা নিতে হবে । 

সন্তানকে কোলে আগলে না রেখে ধর্মের প্রকৃত শিক্ষা আকিদায় সাহসী , প্রতিবাদী করে গড়ে তুলুন । দ্বীন-দুনিয়া বাঁচবে  ভবিষ্যৎ  প্রজন্ম বাঁচবে  ইনশাআল্লাহ ।