ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের আচরণ কেমন হওয়া কাম্য?

প্রকাশিত: এপ্রিল ১৪, ২০২১

ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের আচরণ কেমন হওয়া কাম্য?
ইসলাম এমন এক বিপ্লবের নাম যার সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মতো ২য় কোনো বিপ্লব পৃথিবীতে নাই এবং ভবিষ্যতেও হবে না। আমার এই কথায় অনেকেই মুচকি হাসবেন আবার কেউ অট্টহাসি হেসে বলবেন পাগলে কি না বলে ছাগলে কি না খায়।

এমনটা করার কারণ আমি জানি এবং সেটা যৌক্তিকও বটে। রাসূলাল্লাহ ওফাত পরবর্তী জাজিরাতুল আরব পেরিয়ে ইসলাম যেভাবে পৃথিবীর মূল ভূখন্ডে ছেয়ে ফেলেছিল তার ধারেকাছে যাওয়ার মতো কোনো সভ্যতা তৎকালীন দুনিয়ায় ছিল না। তাও কাদের দ্বারা এটা হলো?  যাদেরকে রোমান-পারস্য, মিশরীয় সভ্যতা অবজ্ঞাভরে পাশ কাটিয়ে গিয়েছে। মরুভূমির মেষ পালক জাজাবর বলে যাদেরকে বন্দি করা ছিল জেলখানা পঁচানো,নষ্ট করা সেই জাজাবর আরবরাই কি না তৎকালীন পরাশক্তি  রোমান-পারস্যকে জয় করে। এটা বিস্ময়ের না হলে বিস্ময় কোনটা? 

পরবর্তীকালে ইসলামী শাষন না থাকলেও  মুসলিম শাষকরা শাষন করেছে শতসহস্র বছর। শাষকে শাষকে দ্বন্দ্ব, রাজনৈতিক সংকট , ভাতৃঘাতী সংঘাত হয়েছে।  এসবকিছুর পরও ইসলাম ছড়িয়েছে পৃথিবীব্যাপী, সকল  ধর্মই বাস করেছে সহদোর ভাইয়ের মতো। 

ইসলামের এই উত্থান ইহুদিদের ভালো লাগেনি। তাই বুদ্ধিমান এই জাতিটি বুদ্ধিমান হওয়া সত্বেও সত্যের পরশ পায়নি। অহংকারীরা কখনো সত্য বুঝতে পারে না। ইসলামের শুরু থেকে রাসূলের প্রতিটি কাজে তারা প্রত্যক্ষ পরোক্ষভাবে রাসূলাল্লাহর কাজে বিঘ্ন ঘটানোর চেষ্টা করেছে। এর ধারাবাহিকতা পরবর্তীকালে গুরুতর থেকে গুরুতর হয়েছে।

একসময়ের অর্ধ পৃথিবী জয় করা ইসলাম আজ ব্যক্তিগত আমল আর কিছু আচার-অনুষ্ঠানে সীমাবদ্ধ। এই পর্যায়ে হুট করেই আসিনি। ইসলাম স্পষ্ট, পূর্ণাঙ্গ, একমাত্র গ্রহণযোগ্য দ্বীন/জীবনব্যবস্থা (আল ইমরান-১৯,৮৫,মায়েদা-০৩) হওয়ার পরও ১৬০ কোটি মুসলিমসহ সমগ্র মানবজাতি গাইরুল্লাহকে মেনে ঈমানের পাশাপাশি  স্পষ্ট শেরকে নিমজ্জিত। (সূরা ইউসুফ -১০৬)

সময়ের এই মুহূর্তে এসে জাতির কিছু শ্রেষ্ঠ সন্তান  চেষ্টা করছে আল্লাহর দ্বীনকে আবার বিজয়ী করতে। তাদের আকিদা, কর্মসূচী ভুল হলেও তাদের চাওয়া-পাওয়ায় যে কোনো ত্রুটি নেই এটা স্বীকার করতেই হবে। 

আমরা মধ্যপ্রাচ্যের ইখওয়ানুল মুসলিমিন,ভারতীয় উপমহাদেশে জামায়াতে ইসলামীর মতো বিশাল আন্দোলনগুলোকে জ্বলে উঠতে দেখেছি আবার নিভে যেতে দেখেছি। অন্যায় হিসেবে ঘোষনা করতে দেখেছি আবার সেই  অন্যায়ের সাথে আপোষ করতেও দেখেছি। লক্ষ্য বাস্তবায়নে অস্থির হতে দেখেছি। অস্থির হয়ে শক্তি প্রদর্শন করা গেলেও আদর্শ বাস্তবায়ন করা যায় না । 

আমাদের  কর্মপদ্ধতি রাসূলাল্লাহর জীবনী । 

কিন্তু আমরা সেই জীবনী প্রত্যাখ্যান করে  নিজেদের মতো করে কর্মপদ্ধতি বানিয়ে নিয়েছি । 

এগুলো আত্মসমালোচনা। আত্মসমালোচনা ভবিষ্যৎ পথকে নির্ভূল করে । খোলা মন নিয়ে লিখছি খোলা মনে গ্রহণ করার আহ্বান জানাচ্ছি । 

এই উপমহাদেশে ইসলামকে যারা ক্ষমতায় নিতে চায় সেই তারাই যখন আরেকটা ইসলামী আন্দোলনকে গালাগালি করে তখন তাদের  আদর্শের প্রতি আঙ্গুল উঠে। কেমন আদর্শের সৈনিক তারা  ?  যারা অন্য একটা আদর্শকে এখনই সহ্য করতে পারে না, গালি দিয়ে বসে সেই তারাই যদি কখনো ক্ষমতায় যায় (?) তারা জনমানুষের  কতোটুকু নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে তা ভাবনার বিষয়। 

একজন যোদ্ধা অপর যোদ্ধাকে অস্ত্র দিয়ে মোকাবেলা করে তদ্রূপ একটি আদর্শ আরেকটি আদর্শকে যুক্তি প্রমাণ দিয়ে মোকাবেলা করবে। এখানে মোকাবেলা হবে যুক্তি-প্রমাণ,তথ্য দিয়ে। তার বদলে যদি অনর্গল  গালি বের হয় তাহলে কি এটা বলার দরকার হয় কোনটি দূর্বল আদর্শ? 

এটা সূর্যের আলোর মতো পরিষ্কার। 

কিছু মানুষের মুখে ইসলামের  জয়জয়কার,হুংকার শুনতে পাওয়া গেলেও ত্যাগের ময়দানে সেই সংখ্যাটা খুবই নগন্য। 

গত কয়েকদিনে আমি সবচেয়ে বেশী সম্মুখীন হয়েছি  এই ঘটনার। তাদের দায়িত্বশীলদের যখন জিজ্ঞেস করা হলো এরা কি আপনাদের আদর্শের সৈনিক? 

তারা পরিচয় স্পষ্ট করলেন না। 

মন চাইলো আর সাথী বানালাম এমন সাথী সংখ্যা বাড়ালেও ময়দানে  আবদুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের মতো আচরণ করবে। তাই ইসলামী আন্দোলনের দায়িত্বশীলদের প্রতি দাবি রইলো নিজেদের কর্মীদের পরিচয় স্পষ্ট করুন। নয়তো তার দায়ভার আপনাদেরকেই নিতে হবে । 

যারা প্রকৃতই ইসলাম চান তাদের প্রতি আমার কিছু আবদার। যেহেতু আপনার চাওয়া-পাওয়া আর আমার চাওয়া-পাওয়া এক তাই বলছি । 

মানুষের সবচেয়ে মূল্যবান জিনিস তার বিশ্বাস তথা ঈমান। ঈমানের আগে গুরুত্বপূর্ণ  বিষয় আকিদা অর্থাৎ সম্যক ধারণা বা সামগ্রিক ধারণা (Comprehensive Concept)।  আপনার আমার এই সরল বিশ্বাসকে পুজি করে  কেউ ভুল পথে নিচ্ছে না তো ? 

ইসলামে তিনটি জিনিস পরষ্পর সম্পৃক্ত-

১। আকিদা

২। ঈমান 

৩। আমল

ঈমানহীন আমল মূল্যহীন আবার আকিদাবিহীন ঈমান মূল্যহীন । আজ এইসব বিষয়ে প্রশ্ন করলে  আল্লাহর উপর দায় চাপিয়ে মুক্ত হতে চাই । আল্লাহর উপর দায় চাপিয়েই যদি মুক্ত হওয়া যায় তাহলে বিচার দিবস কেন ? 

তাই বলবো আপনার পরিচয় আগে ক্লিয়ার করুন । 

যারা বিভিন্ন ইসলামী আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত তাদেরকে বলবো আপনার আচরণ আপনার দলের ভাবমূর্তি বহন করে । আপনি যেহেতু ইসলামী দল করেন সেহেতু আপনি সাদা কাপড়ের ন্যায় । অন্যরা হাজারটা করলেও চাক্ষুষ হয় না কিন্তু আপনি একটা করলেই সেটা জ্বলজ্বল করে । ইস্যুভিত্তিক আন্দোলনে কখনো স্থায়ী কোনো সমাধান দিতে পারে না। আমরাই বয়কট করলাম আবার আমরাই তাদের সাথে বৈঠক করি।

আমরা তওহীদি জনতার সামনে বজ্রকন্ঠে হুংকার দিলাম আবার ক্যামেরার সামনে  মুখ পুছে না করলাম এটা কি দ্বিচারিতা নয় ? এগুলো যাচাই-বাছাই করার আবশ্যকতা অনস্বীকার্য । 

গত কয়েকমাসের ঘটনা  নিজেদের অবস্থান যাচাই করার জন্য যথেষ্ট বলে আমি মনে করি। 

যারা ইসলামী আন্দোলন করেন আমি জানি তারা অন্য দশজনের থেকে আলাদা। তাদের চিন্তাধারা কিছুটা হলেও উন্নত। তাই বলে অহংকারবশত  অন্যকে  তুচ্ছতাচ্ছিল্য না করে সবার কথাই শুনা উচিৎ । 

হাদীসে এসেছে-

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, "ইসলাম অপরিচিত অবস্থায় পদযাত্রা শুরু করেছে আবার অপরিচিত অবস্থায় ফিরে যাবে। সুসংবাদ অপরিচিত ব্যক্তিদের জন্য। সুসংবাদ গুরাবাদের জন্য। "

সাহাবায়ে কেরাম (রা)  জিজ্ঞাস করলেন ইয়া রাসূলুল্লাহ্ গুরাবা কারা ? 

রাসূল সাঃ. বললেন, "মানুষেরা যখন পথভ্রষ্ট হয়ে যাবে, সমাজ যখন নষ্ট হয়ে যাবে তখন সেই পথভ্রষ্ট মানুষদেরকে যারা হেদায়েতের পথ দেখাবে, সেই নষ্ট সমাজকে যারা সংস্কারের চেষ্টা করবে তারাই গুরাবা।"

অন্য হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, রাসূল সাঃ. বলেন, সুসংবাদ গুরাবাদের জন্য। সাহাবায়ে কেরাম (রা) জিজ্ঞাস করলেন,  হে আল্লার রাসূল  গুবারা কারা? 

রাসূল সাঃ. বললেন, "অনেক মানুষের ভিড়ে অল্পসংখ্যক ভাল মানুষ। যাদের অনুসারীদের চেয়ে বিরোধীদের সংখ্যাই বেশী হবে।"

গুরাবা একটি আরবী বহুবচন শব্দ। এর একবচন হলো গরিব।

গরিব শব্দের শাব্দিক অর্থ হচ্ছে :—

বিদেশি, প্রবাসী, আগন্তুক, মুসাফির,  অপরিচিত ইত্যাদি।

পারিভাষিক অর্থে প্রচলিত ধ্যানধারণা মোতাবেক যারা ইসলামের কথা বলেন তাদের থেকে ব্যতিক্রমী একদল লোক যারা সমাজের দৃষ্টিতে উপেক্ষিত, অবহেলিত তাদের দ্বারাই আবার ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হবে। আর তারাই গুরাবা । 

সুতরাং যারা যে লেবাসেই হোক না কেন ইসলাম নিয়ে কেউ কোনো কথা বললে মনযোগ দিয়ে পুরোপুরি শুনা উচিৎ। 

আল্লাহ বলেন,

الَّذِينَ يَسْتَمِعُونَ الْقَوْلَ فَيَتَّبِعُونَ أَحْسَنَهُ ۚ أُولَـٰئِكَ الَّذِينَ هَدَاهُمُ اللَّهُ ۖ وَأُولَـٰئِكَ هُمْ أُولُو الْأَلْبَابِ

যারা মনোনিবেশ সহকারে কথা শুনে, অতঃপর যা উত্তম, তার অনুসরণ করে। তাদেরকেই আল্লাহ সৎপথ প্রদর্শন করেন এবং তারাই বুদ্ধিমান। (সূরা যুমার-১৮)