ফিলিস্তিন প্রেক্ষাপট নিয়ে মুসলিমদের করণীয়

প্রকাশিত: মে ১৭, ২০২১

"ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা নেয় না।" একথার সত্যতা নিয়ে কেউ দ্বিমত করবেন না জানি । বর্তমান বুঝতে হলে অতীতে যেতে হবে তাই আমি সামান্য অতীতে যাচ্ছি । 

ফিলিস্তিন বা প্যালেস্টাইন

এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকা এই তিন মহাদেশের জন্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক অবস্থানে রয়েছে । ইহুদি ও খৃষ্ট ধর্মের জন্মস্থান, মুসলমানদের প্রথম কিবলা এখানে অবস্থিত । 

ফিলিস্তিন প্রেক্ষাপট নিয়ে মুসলিমদের করণীয়

ইহুদীরা প্রায় ২০০০ হাজার বছর সকল জাতি কর্তৃক নির্যাতিত , নির্বাসিত হয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকার পর ২য় বিশ্বযুদ্ধের পর ইহুদীরা সারা বিশ্ব থেকে ফিলিস্তিনে একত্রিত হতে থাকে । মুসলমানরা আশ্রয়ও দেয় ইহুদীদেরকে ।  হাজার কতক লোক  এ আর এমন কী ।

ইহুদীবাদের জনক থিওডর হার্টজেল  প্রথমে বৃটিশ এবং পরে আমেরিকানদের মাধ্যম ধরে আশ্রয়দ্বাতা  ফিলিস্তিনীদেরকে ফিলিস্তিন  থেকে  হটিয়ে ইহুদী রাজ্যের গোড়াপত্তন করেন । আজ সেখানে মুসলমানরাই শরনার্থী। গজব কাকে বলে । 

এখানে বলে রাখা ভালো ইহুদী ধর্ম আর ইহুদীবাদ (Zionism) এক জিনিস নয় । 

ফিরে আসি বর্তমানে ।  

ইহুদীবাদ   যখন  ফিলিস্তিন মুসলমানদের কচুকাটা করতে থাকে তখন মুসলান রাষ্ট্রগুলো কি  তাদের রক্ষার্থে  সম্মিলিতভাবে এগিয়ে এসেছিল ? 

আসেনি ।

বরং আজ যেমন ঈদ উদযাপন করছে  তখনও একইভাবে  ঈদ উদযাপন করেছে এবং এটা শুধু এক ফিলিস্তিন নয় যখনই এক মুসলিম দেশ আক্রান্ত হয়ে তখন অন্য মুসলিমরা উট পাখির মতো বালিতে মাথা গুজে বাঁচতে চেয়েছে । কিন্তু বালিতে মাথা গুজলেই যেমন বালিঝড় এড়ানো যায় না তেমনি  তারাও বিপদ এড়াতে পারেনি ।  

বর্তমানে ফিলিস্তিন ইস্যু নিয়ে কিছু লোকের  দরদ উপচে পরছে । হটাৎ দেখে কেউ আবেগে আপ্লূত হবেন যে কত ভালবাসা তাদের প্রতি  ।  কিন্তু দীর্ঘ সময় নিয়ে দেখলে বুঝতে পারবেন এগুলো  মায়াকান্না । দীর্ঘদিন বড় কোনো ইস্যু নাড়াচাড়া করতে না পারায়  আবেগ জমে আছে খানিকটা । 

ফিলিস্তিনীদের জম্য এমতাবস্থায় সেই জমাকৃত আবেগটা ফুসলে উঠেছে মাত্র । যার স্থায়িত্ব পানিতে বলক উঠার মতো । আজ বাদে কাল যে যার যার মতো । 

এখন বর্তমানে আসা যাক। 

৫৪৪৪ কিলোমিটার দূরের ফিলিস্তিন নিয়ে বাংলাদেশের এতো  চিন্তার কারণ কী তার সাথে বাংলাদেশের কী সম্পর্ক ? 

কারণ পাকিস্তানীদের মতো তাদের  ভাষা, গায়ের রং, খাবার, আবহাওয়া, সংস্কৃতি এককথায় সবকিছু আমাদের থেকে আলাদা হওয়া সত্বেও শুধুমাত্র ধর্মের কারণে আমরা এক জাতি । যদিও এখন জাতি নাই । শুধুমাত্র জনসংখ্যা বলা যায় ।

তাছাড়া ফিলিস্তিন যেমন তিন মহাদেশের জন্য ভৌগোলিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ তেমনি বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানও উঠতি পরাশক্তিগুলোর জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ ।

সভ্যতার পালাবদলে  বিশ্ব রাজনীতিতে এই সময়টা   টার্নিং পয়েন্ট  একইসাথে  ভৌগলিক অবস্থান ,  পারষ্পরিক সম্পর্ক বজায় ও পরনির্ভরশীলতার দিক দিয়ে বাংলাদেশের জন্য  চিন্তার ব্যাপার ।  

চেচনিয়া, বসনিয়া, কাজাখিস্তান , বেলুচিস্তান, আফগানিস্তান , ইরাক, ইরান, লেবানন, হার্জেগোভিনা, সিরিয়া, তুরস্ক, কাশ্মীর, ঘরের পাশে মায়ানমার। 

এই দেশগুলোতে মুসলিম নির্যাতনের ধারাবাহিকতা , সময়ের পার্থক্য বিচার বিবেচনা চিন্তা করলে  বাংলাদেশ পরবর্তী সিরিয়ালে থাকাটা অস্বাভাবিক নয় । আর বাংলাদেশে সেই পরিস্থিতি সৃষ্টির জন্য  ধর্ম প্রধান সহায়ক। আমরা ধর্মজীবীদের আস্ফালন দেখলাম । সরকার এখন তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেও তাদের বৃহৎ অন্ধ অনুসারী ধর্মবিশ্বাসী , ধর্মভীরুদের, ধর্ম সম্পর্কে অজ্ঞ লোকদের কিভাবে নিয়ন্ত্রন করবেন ?  

জনগণের সামনে এখন  ধর্মের প্রকৃত রুপ তুলে ধরতে হবে তবেই তারা চিলের পেছনে দৌঁড়াবে না । যে কেউ ধর্মের দোহাই দিয়ে  অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারবে না । 

আয়তনে বাংলাদেশের তুলনায় সাড়ে ৪ গুণ বড়  মায়ানমার  ।  বাংলাদেশের জনসংখ্যা সোয়া ১৬ কোটি (২০১৯) মায়ানমারের প্রায় সাড়ে ৫ কোটি (২০১৭), অথচ ২০১৫ সালে জনসংখ্যা ছিল ৬ কোটি ৭৬ হাজারের উপরে। 

খেয়াল করুন  সবজায়গায়  দিনদিন জনসংখ্যা বাড়ে আর মায়ানমারে  কমে ।

রোহিঙ্গা ইস্যুতে মায়ানমার সরকার তারই দেশের রাখাইন রাজ্যের  মুসলমানদের উপর কিরুপ আচরণ করেছে তা সকলেরই জানা । পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র হওয়ায়  বিশ্ব রাজনৈতিক কৌশলগত কারণে  ঘনবসতিপূর্ণ  ছোট্ট একটা দেশ হওয়া সত্বেও  সোয়া ১৮ লাখ(২০১৮) রোহিঙ্গা অধিবাসীদেরকে  আশ্রয় দিয়েছে বাংলাদেশ । এই সংখ্যাটা কলাগাছের মতো বৃদ্ধি পাচ্ছে এটা বুঝাই যায় । 

গ্রামবাংলায় একটা কথা প্রচলিত আছে, "বসতে দিলে খাইতে দেয়া লাগে , খাইতে দিলে শুইতে দেয়া লাগে , শুইতে দিলে হাগু করতে দেয়া লাগে ।"

রোহিঙ্গা ইস্যুর শুরুতে  ঈমানী জোর  ,  মানবিকতা দেখিয়ে অনেক বাদ প্রতিবাদ বিভিন্ন মহল থেকে হয়েছে কিন্তু তাদের মাতৃভূমি ফিরিয়ে দেয়া যায়নি ।  কিসের জাতিসংঘ কিসের ওআইসি। 

দুদিন পর  সেই বিশাল ইস্যু পুরনো হয়ে   নতুন ইস্যুর নিচে  চাপা পরে গেছে । সময়ক্ষেপণ করে মাতৃভূমি ফিরিয়ে দেয়ার বদলে ভাসানচরে তাদের আবাসন ব্যবস্থা করে দেয়া হলো । দয়া কাকে বলে !  

অথচ জনসংখ্যায়  পৃথিবীর ২য় বৃহত্তম, ৬০%  প্রাকৃতিক সম্পদের মালিক , ৬৫ টি রাষ্ট্রের মালিক মুসলিমরা তাদেরই ভাইয়ের মাতৃভূমি গত ৩ বছরেও  ফিরিয়ে দিতে পারলো না । 

"কানা ছেলের নাম পদ্মলোচন ।"

যারা ফিলিস্তিন ইস্যু নিয়ে অন্যকে দোষারোপ করছেন ফিলিস্তিন নিয়ে কিছু না বলায় তারা এব্যাপারে কী বলবেন  ? 

ও এটাতো পুরাতন হয়ে গেছে ।  তাইনা?

বাংলাদেশ যাদেরকে আশ্রয় দিল তারা বাংলাদেশের প্রতি কিরকম আচরণ করলো, করছে  তার যথেষ্ট প্রমাণ  জাতীয় দৈনিকগুলোর কাছে রয়েছে । 

তাহলে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আল্লাহ না করুক ফিলিস্তিনীদের  মতো পরিণতি হওয়াটা কি অস্বাভাবিক ? 

"Necessity knows no law " প্রয়োজন আইন মানে না ।

ধর্মও মনে না, কিচ্ছু মানে না । 

তাহলে উপায় ? 

এই সমস্যার সমাধান শুধু সরকার অথবা শুধু জনগণের পক্ষে সম্ভব নয় । আবার শুধু ক্ষমতা বা  শুধু আদর্শ দিয়েও সম্ভব নয়। উভয়ের সম্মিলিত প্রয়াসে সম্ভব ।  এটাকে শুধুমাত্র রাজনৈতিক সংকট ভাবলে হবে না ।  আমরা মোমেন মুসলিম বলে পরিচয় দিয়ে থাকি । 

মোমেনদের ব্যাপারে  আল্লাহর বাণী,

اللَّهُ وَلِيُّ الَّذِينَ آمَنُوا يُخْرِجُهُم مِّنَ الظُّلُمَاتِ إِلَى النُّورِ ۖ وَالَّذِينَ كَفَرُوا أَوْلِيَاؤُهُمُ الطَّاغُوتُ يُخْرِجُونَهُم مِّنَ النُّورِ إِلَى الظُّلُمَاتِ ۗ أُولَـٰئِكَ أَصْحَابُ النَّارِ ۖ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ

(আল বাকারা - ২৫৭)

যারা ঈমান এনেছে, আল্লাহ তাদের অভিভাবক। তাদেরকে তিনি বের করে আনেন অন্ধকার থেকে আলোর দিকে। আর যারা কুফরী করে তাদের অভিভাবক হচ্ছে তাগুত। তারা তাদেরকে আলো থেকে বের করে অন্ধকারের দিকে নিয়ে যায়। এরাই হলো দোযখের অধিবাসী, চিরকাল তারা সেখানেই থাকবে।

وَعَدَ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنكُمْ وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ لَيَسْتَخْلِفَنَّهُمْ فِي الْأَرْضِ كَمَا اسْتَخْلَفَ الَّذِينَ مِن قَبْلِهِمْ وَلَيُمَكِّنَنَّ لَهُمْ دِينَهُمُ الَّذِي ارْتَضَىٰ لَهُمْ وَلَيُبَدِّلَنَّهُم مِّن بَعْدِ خَوْفِهِمْ أَمْنًا ۚ يَعْبُدُونَنِي لَا يُشْرِكُونَ بِي شَيْئًا ۚ وَمَن كَفَرَ بَعْدَ ذَٰلِكَ فَأُولَـٰئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ

(আন নূর - ৫৫)

তোমাদের মধ্যে যারা বিশ্বাস স্থাপন করে ও সৎকর্ম করে, আল্লাহ তাদেরকে ওয়াদা দিয়েছেন যে, তাদেরকে অবশ্যই পৃথিবীতে শাসনকর্তৃত্ব দান করবেন। যেমন তিনি শাসনকর্তৃত্ব দান করেছেন তাদের পূর্ববতীদেরকে এবং তিনি অবশ্যই সুদৃঢ় করবেন তাদের  জীবনব্যবস্থাকে, যা তিনি তাদের জন্যে পছন্দ করেছেন এবং তাদের ভয়-ভীতির পরিবর্তে অবশ্যই তাদেরকে শান্তি দান করবেন। তারা আমার এবাদত করবে এবং আমার সাথে কাউকে শরীক করবে না। এরপর যারা অকৃতজ্ঞ হবে, তারাই অবাধ্য।

وَاللَّهُ وَلِيُّ الْمُؤْمِنِينَ

(আল ইমরান - ৬৮)

আর আল্লাহ হচ্ছেন মুমিনদের বন্ধু। আত্মসমালোচনার জন্য এই কয়টিই যথেষ্ট । তাহলে আমরা কি মোমেন আছি না নেই ? নিজের অবস্থান যাচাই করার দায়িত্ব যার যার নিজের । 

তাহলে করণীয় কী ? 

১। আবেগের বশবর্তী না হয়ে  বাস্তবতা দিয়ে যেকোনো ইস্যুকে বিচার করা । 

২। নিজ ধর্ম সম্পর্কে আকিদা পরিপূর্ণ করা । 

৩। কারো কথায় হুজুগে না মেতে সত্যতা যাচাই করা। 

৪। নিজেদের লক্ষ্য উদ্দেশ্য নির্ধারণ করা এবং সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য সঠিক কর্মপদ্ধতি নির্ধারণ করা । 

৫। ঐক্য ছাড়া, নেতা ছাড়া কোনো কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পাদন সম্ভব নয় তাই লক্ষ্য অর্জনের জন্য একজন নেতার আনুগত্য করা।

৬। স্রষ্টা আমাদের সৃষ্টি করেছেন । তিনিই ভালো জানেন কোন পথে আমাদের কল্যাণ  তাই তার দেয়া পথে থেকে এসমস্ত কিছু করা। তবেই মুক্তি মিলবে । 

প্রকৃতই যদি  ফিলিস্তিনীদের জন্য, রোহিঙ্গাদের জন্য, মানবতার জন্য মন কাঁদে তাহলে যত দ্রুত সম্ভব আল্লাহর দেয়া চুক্তি কলেমা লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ ( সাঃ) এর উপরে ঐক্যবদ্ধ হোন । 

যদি না হোন অপেক্ষা করেন  ফিলিস্তিনী ,  রোহিঙ্গাদের ভাগ্যকে বরণ করার । একটা কথা আছে , " জনম যাবো কর্ম করতে, দুই হাটু যাবো নামাজ পড়তে। "

আর যদি সকল অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের পক্ষে আল্লাহর হুকুমের উপর ঐক্যবদ্ধ হতে পারি তাহলে ভূখা-নাঙ্গা, নিরক্ষর আরবরা যেমন তৎকালীন সুপার পাওয়ার  রোম-পারস্যকে হটিয়ে  বিশ্ববাসীকে এক স্বর্ণযুগ উপহার দিয়েছিল তেমনি বিশ্বের দরবারে অবহেলিত আজকের বাঙ্গালীরা  পরাশক্তিধর সভ্যতার নামে অসভ্যতাকে হটিয়ে সূচনা করবে এক মহান সভ্যতার । 

সেই চুক্তির দিকে ডাকছে হেযবুত তওহীদ । 

জানতে উম্মুক্ত মন নিয়ে  ভিজিট করুন ( hezbuttawheed.org)  যেকোনো বক্তব্য পুরোপুরি শুনুন, কারো অন্ধ অনুসরণ নয় নিজের আক্বল খাটিয়ে কুরান, রাসূলাল্লাহ জীবনী, ইতিহাস দিয়ে বিচার করুন ।  মনে রাখবেন আপনার বিচারবুদ্ধির জন্যই আপনাকে হিসাবের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে । 

আল্লাহ বলেন,

هُدًى لِّلْمُتَّقِينَ

অর্থাৎ এই কোরআন মুত্তাকিদের জন্য হেদায়াত সঠিক–সরল পথনির্দেশ'  (সুরা বাকারা, আয়াত: ২)

وَلَقَدْ يَسَّرْنَا الْقُرْآنَ لِلذِّكْرِ فَهَلْ مِن مُّدَّكِرٍ

(আল ক্বামার - ১৭, ২২ , ৩২ , ৪০) 

আমি কোরআনকে সহজ করে দিয়েছি বোঝার জন্যে। অতএব, আছে কি কোন চিন্তাশীল ? 

الَّذِينَ يَسْتَمِعُونَ الْقَوْلَ فَيَتَّبِعُونَ أَحْسَنَهُ ۚ أُولَـٰئِكَ الَّذِينَ هَدَاهُمُ اللَّهُ ۖ وَأُولَـٰئِكَ هُمْ أُولُو الْأَلْبَابِ

(সূরা আয্‌-যুমার - ১৮)

যারা মনোনিবেশ সহকারে কথা শুনে, অতঃপর যা উত্তম, তার অনুসরণ করে। তাদেরকেই আল্লাহ সৎপথ হেদায়াহ প্রদর্শন করেন এবং তারাই বুদ্ধিমান।