হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম - বায়োগ্রাফি

প্রকাশিত: জুন ০৮, ২০২১

জনাব হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম (Hossain Mohammad Salim) অরাজনৈতিক, ধর্মীয় সংস্কারমূলক আন্দোলন হেযবুত তওহীদ-এর বর্তমান 'এমাম' বা নেতা। 

হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম
ছবি: হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম, এমাম, হেযবুত তওহীদ
Facebook Official Pagehttps://www.facebook.com/emamht/


জন্ম:

১৯৭২ সালে নোয়াখালী জেলার সোনাইমুড়ি থানার পোরকরা গ্রামের সবচেয়ে প্রভাবশালী ও সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে তাঁর জন্ম। বাবা নুরুল হক মেম্বার দুই যুগের অধিককাল স্থানীয় জনপ্রতিনিধি হিসাবে সুখ্যাতি অর্জন করেছেন। মা হোসনে আরা বেগম।

শিক্ষা: 

স্থানীয় মক্তবে পড়াশোনা শুরু করেন এবং খুব অল্প বয়সে কোর’আনসহ অন্যান্য আদব-কায়দা শিক্ষালাভ করেন। পোরকরা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক শিক্ষালাভ করার পর তিনি স্থানীয় আহমদিয়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৮৯ সালে বিজ্ঞান বিভাগে এস.এস.সি. পাস করেন। তারপর লাকসাম নওয়াব ফয়জুন্নেসা সরকারী কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে এইচ.এস.সি. এবং একই কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রী লাভ করেন। তারপর ১৯৯৪ সালে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বি.এস.এস. পরীক্ষায় তিনি প্রথম শ্রেণীতে প্রথম স্থান অধিকার করেন। অতঃপর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী লাভ করেন।

সত্যের সন্ধান: 

ছাত্রজীবন থেকেই তিনি ভাবতেন মুসলমান জাতির দুরবস্থা নিয়ে। কলেজের হোস্টেলে দৈনিক ইত্তেফাক ও দৈনিক ইনকিলাব- এই দু’টি পত্রিকা রাখা হতো। ইনকিলাবে বসনিয়ার বিভিন্ন মুসলমানদের অবস্থা, বিভিন্ন জায়গার মুসলমানদের নির্যাতনের কাহিনী পড়ে তার চিন্তার জগতে আলোড়ন ওঠে। তিনি পৃথিবীময় মুসলিম জাতির দুরবস্থা দেখে ব্যথিত হন। ভাবতে থাকেন কেন এই বিপর্যয়, কোন পথে মুক্তি। জাতির এই দুরবস্থা থেকে মুক্তির পথ সন্ধান করতে তিনি ছুটে যান বিভিন্ন ধর্মীয় সংগঠন, বিভিন্ন ব্যক্তি, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে। কিন্তু কেউ তাঁর সত্যসন্ধানী আত্মার খোরাক যোগাতে পারত না। ধর্মীয় বা রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মকাণ্ড দেখে তিনি হতাশ হতেন। বিভিন্ন অসঙ্গতি, কথার সাথে কাজের অমিল, গোঁজামিল, অযৌক্তিক কর্মকাণ্ড ইত্যাদি দেখে তিনি বিরক্ত হতেন। তিনি দেখলেন, ধর্মের নামে অনেক কিছু চললেও সবই যেন স্বার্থপরতারই নামান্তর মাত্র।

হেযবুত তওহীদে যোগদান: 

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন তিনি ঢাকায় এমামুযযামান জনাব মোহাম্মদ বায়াজীদ খান পন্নীর নাম শোনেন। এমামুযযামানের লেখা বই নিয়ে তখন সেখানে ব্যাপক তোলপাড় চলছিল। এক শ্রেণির আলেম তাঁর বই নিষিদ্ধ করার জন্য মিছিল করছিল। তিনি লোকমুখে এমামুযযামান সম্পর্কে শুনতেন যে, এমামুযযামান এমন একজন লোক যার দাড়ি নাই, টুপি নাই, মাদ্রাসায় পড়েন নাই, কিন্তু তিনি এমন একটা বই লিখেছেন যে বইটার কারণে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে, আলেমরা তার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করছে। কিন্তু তিনি লোকের কথায় কান না দিয়ে বইটি সংগ্রহ করে পড়তে থাকলেন এবং সিদ্ধান্ত নিলেন যে, এমামুযযামানের সাথে দেখা করবেন, তাঁকে সরাসরি পর্যবেক্ষণ করবেন।

১৯৯৮ সাল। টাঙ্গাইলের করটিয়ার দাউদ মহলে হেযবুত তওহীদের এক সম্মেলনে যোগ দিলেন তিনি। এই সম্মেলনে একমাত্র তিনিই হেযবুত তওহীদের সদস্য না হয়ে যোগ দেওয়ার অনুমতি পেয়েছিলেন। এমামুযযামানের অসাধারণ ব্যক্তিত্ব, সরলতা, কথার মাধুর্য এবং যুক্তিবোধ তাকে অভিভূত করল। এমামুযযামান মাদ্রাসায় পড়েন নি অথচ ধর্মের ব্যাপারে কী অগাধ পাণ্ডিত্য তাঁর! জমিদার বাড়ির সন্তান, কিন্তু অহংকারের লেশমাত্র তাঁর কথাবার্তা, চালচলনে নেই। তিনি দেখলেন, এমামুযযামানের সামনে বসে যারা তাঁর আলোচনা শুনছে তারা কেউ কৃষক, কেউ শ্রমিক, এক কথায় সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ। যারা এক সময় তাদের প্রজা ছিলেন, যারা দাউদ মহলের সামনে দিয়ে হাঁটারও সাহস পেত না, তাদেরকে নিয়ে তিনি একসাথে চা খাচ্ছেন, খানা খাচ্ছেন, গল্প করছেন, ইসলামের বিষয় বুঝাচ্ছেন, কারো কোনো প্রশ্ন থাকলে জবাব দিচ্ছেন, অসুস্থদের খোঁজ-খবর নিচ্ছেন, যেন তারাও তাঁরই পরিবারের সদস্য।

এসব বিষয় তাঁর মনে অনেক নাড়া দেয়। আবার খটকাও লাগে, কারণ এতদিন ধরে ইসলামের যে রূপ তিনি দেখে আসছেন তার সাথে দৃশ্যগুলো ঠিক মেলাতে পারছিলেন না। যেমন- এমামুযযামানের মিটিংয়ের এক পাশে মেয়েরাও বসতেন। ছেলে মেয়েরা এক জামাতে সালাহ (নামাজ) কায়েম করছেন ইত্যাদি। যাহোক, সব মিলিয়ে তিনি এমামুযযামানের কথায় প্রচণ্ডভাবে আকৃষ্ট হলেন। তিনি বুঝতে পারলেন, সত্য যদি থেকে থাকে সেটা এখানেই আছে। পরদিনও এমামুযযামানের কথা শুনলেন। যতই শুনলেন ততই তাঁর সম্মুখে সত্য সুস্পষ্ট হতে লাগল। তিনি যেন স্বচক্ষে দেখতে পেলেন ঠিক কোন জায়গাটাই ভুল করছে এই মুসলিম নামধারী জাতি, কোথায় পথ হারিয়েছি আমরা। তওহীদ থেকে সরে যাবার কারণেই আজ তাদের এই দুর্দশা। পুনরায় তওহীদে ফিরে গেলেই তাদের মুক্তি, তারা পাবে ইহকালে শান্তি, পরকালে জান্নাত, অন্য কোনোভাবে নয়। তওহীদের অর্থ কী, তাৎপর্য কী সেটা তিনি এমামুযযামানের কাছে থেকে ভালভাবে বোঝার চেষ্টা করেন। তারপর ঢাকায় এসে আরও বই-পুস্তক পড়েন। তারপর ফেব্রুয়ারী মাসের ২৮ তারিখে হেযবুত তওহীদ আন্দোলনে যোগদান করেন। সেই থেকে তাঁর সংগ্রামী পথ চলা শুরু।

তিনি জানতেন সত্য প্রকাশে বিপদ আসবে, বাধা-প্রতিবন্ধকতা আসবে, অপমানিত হতে হবে, আল্লাহ পরীক্ষা নিবেন। কিন্তু তাঁর জন্য এই পরীক্ষা মোটেও সহজ ছিল না। গ্রামের বাড়ি নোয়াখালীর সোনাইমুড়িতে গিয়ে যখন তিনি সত্য প্রচার শুরু করলেন, মানুষকে মুক্তির উপায় বোঝাতে লাগলেন, সত্যের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ হবার আহ্বান জানালেন এবং ধর্মের নামে চলা অধর্মগুলোকে প্রকাশ্যে চিহ্নিত করতে লাগলেন তখন এক শ্রেণির ধর্মব্যবসায়ী তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার শুরু করে দিল। খ্রিষ্টান আখ্যা দিয়ে বারবার তাঁর বাড়িঘরে হামলা ও ভাঙচুর করা হয় এবং যারা হেযবুত তওহীদের সদস্য হয়েছিল তাদেরকে মারধোর, নির্যাতন করা হতে থাকে। শুধু ২০০৯ সালেই দুইবার তার বাড়িঘরে হামলা হয়। তাঁদের বাড়িসহ হেযবুত তওহীদের সদস্যদের আরো আটটি বাড়ি আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয় সন্ত্রাসীরা।

তবে সবচেয়ে জঘন্য বর্বরোচিত সন্ত্রাসী হামলাটা হয় ২০১৬ সালের ১৪ মার্চ। তাঁর বাড়ির প্রাঙ্গনে নির্মাণাধীন মসজিদকে গির্জা আখ্যা দিয়ে, হেযবুত তওহীদকে খ্রিষ্টান অপবাদ দিয়ে মসজিদের মাইকে হামলা চালানোর জন্য মানুষকে আহ্বান করা হয়। স্থানীয় মাদ্রাসাগুলো থেকে ছাত্র ও শিক্ষকেরা, বিভিন্ন ধর্মভিত্তিক দলের সন্ত্রাসী বাহিনী এক জোট হয়ে এই দিন তার বাড়িতে হামলা করে প্রকাশ্য দিবালোকে হেযবুত তওহীদের দুইজন সদস্যকে হাত-পায়ের রগ কেটে জবাই করে হত্যা করে। তাদের শরীর পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে পুড়িয়ে দেয়। বাড়িঘর লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করে। তবে এত বাধা-প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও তিনি সত্য প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে পিছপা হন নি কখনই। আবারও সেই ধ্বংসস্তূপের উপর গড়ে তুলেছেন শহীদী জামে মসজিদসহ বিভিন্ন উন্নয়নমুখী প্রতিষ্ঠান।

মাননীয় এমামুযযামান এন্তেকাল করলেন ২০১২ সালের ১৬ জানুয়ারি। এরপর থেকে আন্দোলনের সদস্যদের সর্বসম্মতিক্রমে হেযবুত তওহীদের এমাম হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন তিনি।