তালেবানের শাসন কেমন ছিল?

প্রকাশিত: জুলাই ২২, ২০২১

পত্র-পত্রিকার আন্তর্জাতিক পাতায় বর্তমানে অহরহ যে নামটি শোনা যাচ্ছে, সেটি হলো তালেবান। তালেবান আরবি শব্দ তালেব এর বহুবচন। তালেব অর্থ ছাত্র, আর তালেবান অর্থ ছাত্ররা। দলটির এমন অদ্ভুত নামকরণের কারণ- আফগানিস্তানের এই দলটি যাত্রা শুরু করেছিল ছাত্রদেরকে নিয়ে। নব্বই এর দশকে মাত্র ৫০ জন মাদ্রাসার ছাত্র নিজেদের হাতে অস্ত্র তুলে নিয়েছিল। মোল্লা ওমর ছিলেন তাদের শিক্ষক ও নেতা। একজন শিক্ষক হঠাৎ করেই তার ছাত্রদেরকে পড়াশোনা বাদ দিয়ে হাতে অস্ত্র তুলে দিলেন কেন- তা অগ্রপশ্চাতের ইতিহাস না জানলে বুঝতে পারা সত্যিই কঠিন। কাজেই আলোচনার শুরুতেই আফগানিস্তানের এই সশস্ত্র সংগঠনের উত্থান-কাহিনীটা জেনে নেওয়া দরকার।

তালেবানের শাসন কেমন ছিল?


তালেবানের জন্ম:

১৯৭৯ সাল। বিশ্ব দুই ভাগে বিভক্ত। কমিউনিস্টপন্থী বনাম পুঁজিবাদপন্থী। কমিউনিস্টদের নেতৃত্ব তখন সোভিয়েত ইউনিয়ন, আর পুঁজিবাদের নেতৃত্বে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্র সুযোগ খুঁজছিল কীভাবে সোভিয়েতকে আটকানো যায়। সুযোগও এসে গেল। সোভিয়েত ইউনিয়ন মস্ত এক ভুল করে ফেলল। বলা নেই কওয়া নেই আফগানিস্তান আক্রমণ করে বসল। ব্যস, ধূর্ত যুক্তরাষ্ট্রের মাথায় ভয়ংকর বুদ্ধি খেলে গেল। যুক্তরাষ্ট্র দেখল- আফগানিস্তানের মানুষ প্রচণ্ড ধর্মভীরু, কট্টর ইসলামপন্থী। এই ধর্মভীরু মুসলিমদেরকে যে কোনো উপায়ে বোঝাতে হবে যে, ‘কমিউনিস্ট সোভিয়েত বাহিনী কাফের নাস্তিক এবং এদের বিরুদ্ধে প্রত্যেক মুসলিমের জেহাদ করা ফরজ।’

এমনিতেই আফগানরা যুদ্ধবাজ, তার উপর যদি ধর্মীয় অনুভূতির একটা নির্যাস জুড়ে দেওয়া যায় তাহলে আফগানরা জীবনের পরোয়া করবে না, যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়বে, সোভিয়েত ইউনিয়ন কঠিন বেকায়দায় পড়ে যাবে। শুধু তাই নয়, জেহাদের হুজুগ উঠিয়ে দিলে অন্যান্য মুসলিমপ্রধান দেশ থেকেও যোদ্ধা রিক্রুট করা সহজ হয়ে যাবে। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্র সৌদি আরব, পাকিস্তান, তুরস্ক ও মিশরকে কাজে লাগাল। মুসলিমপ্রধান দেশগুলোতে জেহাদী উন্মাদনা ছড়িয়ে দিল। পাকিস্তানের আইএসআই ও আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের সিআইএ এর যৌথ প্রচেষ্টায়, পশ্চিমা বিশ্বের অর্থে, অস্ত্রে, প্রশিক্ষণে ও পরিকল্পনায় আফগানিস্তানের মাটিতে হানাদার সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে দশকব্যাপী এক যুদ্ধ চলল, যেটাকে জেহাদ বলা হলেও আসলে তা ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সোভিয়েত ইউনিয়নের ছায়াযুদ্ধ। 

এই যুদ্ধের পশ্চাতে কয়েকটি ঘটনা ঘটল।

১. সোভিয়েত ইউনিয়ন পরাজয়ের গ্লানি নিয়ে ১৯৮৯ সালে আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহার করে নিল। 

২. অন্যান্য মুসলিমপ্রধান দেশ থেকে যেসব যোদ্ধারা “জেহাদ” করার জন্য আফগানিস্তানে এসেছিল তারা বিজয়ের উল্লাস করতে করতে নিজেদের দেশে ফেরত গেল এবং জেহাদের নামে সশস্ত্র দল গঠন করে ওইসব দেশে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড আরম্ভ করল। দেশে দেশে জন্ম হলো আল কায়েদার মত সশস্ত্র সংগঠন।

৩. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলো আফগানিস্তান থেকে যেটা চেয়েছিল সেটা পেয়ে যেতেই আফগানিস্তান ত্যাগ করল। দেশটির পুনর্গঠনের জন্য কেউই এগিয়ে এলো না।

৪. আফগান জাতিগোষ্ঠীগুলো ক্ষমতা নিয়ে পারস্পরিক দ্বন্দ্ব সংঘাতে লিপ্ত হয়ে পড়ল। অচীরেই শুরু হলো গৃহযুদ্ধ।

এরপরের আফগানিস্তান হয়ে উঠল আরও ভয়াবহ। এতদিন সোভিয়েত হানাদারদের হাতে রক্ত ঝরত আফগানিস্তানের মুসলিমদের। কিন্তু এবার কথিত জেহাদীরাই একে অপরের রক্ত ঝরাতে শুরু করল। ক্ষমতার কাড়াকাড়ি যেন থামেই না। সুগঠিত সরকারব্যবস্থা নেই। আইন কানুন নেই। বিচার নেই। দুর্নীতি, অনিয়ম, বিশৃঙ্খলা, চুরি, ডাকাতি ইত্যাদি পৌঁছে গেল চরম পর্যায়ে। সাধারণ মানুষ তখন দিশেহারা। এমন সময় তালেবানরা দৃশ্যপটে আবির্ভুত হলো। মোল্লা ওমর অরাজকতার বিরুদ্ধে সশস্ত্র লড়াই আরম্ভ করলেন। জনপ্রিয়ও হলেন। পশতু ভাষাভাষী সুন্নিরা এবার তার নেতৃত্বে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখল। বলা বাহুল্য, এই মোল্লা ওমরও ছিলেন সোভিয়েতবিরোধী যোদ্ধা। ওই যুদ্ধে চারবার আহত হন ওমর। এমনকি চোখও হারিয়েছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের ওই যুদ্ধে। যাহোক পশতুন গোত্রভিত্তিক সুন্নি তালেবানদের ক্ষমতা দ্রুত বাড়তে থাকল। ১৯৯৬ সালে তালেবান কাবুল দখল করে তৎকালীন বোরহানউদ্দিন রাব্বানির সরকার উৎখাত করে তালেবানী শাসন কায়েম করল।

আফগান তালেবানের শাসন কেমন ছিল?

আফগানিস্তানে তালেবানের উত্থান গৃহযুদ্ধকে কিছুটা স্তিমিত করলেও তাদের শাসন আরেক বিতর্কের জন্ম দেয় এবং সারা বিশ্বে প্রবলভাবে সমালোচিত হয়। এই সমালোচনার শুরু হয় তালেবানদের কাবুল দখলের পর থেকেই। কাবুল দখলের দিনই তালেবানরা প্রাক্তন সোশালিস্ট রাষ্ট্রপতি ডা. নাজিবুল্লাহ ও তার ভাইকে বিনা বিচারে প্রকাশ্যে কাবুলের রাস্তায় ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দেয় এবং পরে এই লাশ চারদিনের মাথায় গলিত অবস্থায় নামিয়ে আনা হয়। তালেবানের এই ধরনের কার্যকলাপ সারা বিশ্বে ভীতি ছড়িয়ে দেয়, যা পরবর্তীতে আরও বাড়তে থাকে।

তালেবানী শাসনের যে দিকগুলো নিয়ে সবচেয়ে বেশি সমালোচনা হয়েছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- ১. ইসলামের নামে জনগণের উপর জোর-জবরদস্তি চালানো। যেমন- পুরুষদেরকে দাড়ি রাখতে বাধ্য করা ও নারীদেরকে বোরকা পরতে বাধ্য করা। কেউ অমান্য করলে চাবুকপেটা করা। ২. জনগণের ব্যক্তিস্বাধীনতা ও মানবাধিকারকে গুরুত্ব না দেওয়া। ৩. বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে আশ্রয়, প্রশ্রয় ও সহযোগিতা দেওয়া। ৪. শিল্প ও সংস্কৃতি চর্চাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে নিষিদ্ধ করে রাখা। ৫. সরাসরি নারী শিক্ষার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া। ৬. সরকারি ও বেসরকারি কার্যালয়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ইত্যাদিতে নারীদের অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ করা ইত্যাদি।

এক কথায় আফগান তালেবানরা ইসলামের নামে এমন কিছু নীতি, আইন ও অনুশাসন জারি করেছিল যা সারা বিশ্বে কেবল তালেবানদেরকেই সমালোচনার পাত্র বানায়নি, ইসলামকেও বিতর্কিত করে তুলেছিল।