ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রনীতির ফল: মানবতা নয়, স্বার্থই বিবেচ্য

প্রকাশিত: আগস্ট ০১, ২০২১

ইউরোপে মধ্যযুগে চার্চের যাবতীয় ক্ষমতা বিলুপ্ত করে যখন রাজার হাতে রাষ্ট্রের সর্বময় কর্তৃত্ব অর্পণ করা হলো তখন ইউরোপের বিভিন্ন রাষ্ট্রগুলির নিজেদের মধ্যে অর্থাৎ আন্তঃরাষ্ট্রীয় (Inter States) কিছু সমস্যা দেখা দিল। যেহেতু প্রত্যেকটি রাষ্ট্রের স্বার্থ বিভিন্ন তাই তাদের স্বার্থগুলোও স্বভাবতই সংঘাতমুখী। 

চার্চের কর্তৃত্বকে জাতীয় সামষ্টিক জীবন থেকে বাদ দিয়ে ব্যক্তিজীবনে নির্বাসিত করার ফলে রাষ্ট্রীয় জীবন থেকে ধর্মীয় মানদণ্ড হারিয়ে গেল। তখন স্বভাবতঃই এই রাষ্ট্রগুলির জাতীয় মানদণ্ড হয়ে দাঁড়াল যার যার রাষ্ট্রীয় স্বার্থ। এখন থেকে এই আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে মানবীয় কোন অনুভূতি, ন্যায়-অন্যায়ের কোন প্রভাব কিছুই রইল না এবং আজ পর্যন্তÍও নেই। 

পরবর্তীকালে এই বিভিন্ন ইউরোপীয় খ্রিষ্টান রাষ্ট্র মুসলিম জগৎসহ পৃথিবীর অধিকাংশ দেশ সামরিক শক্তিতে অধিকার করে তাদের ঐ “ধর্মনিরপেক্ষতা” দেবার ফলে আজ পৃথিবীময় বিভিন্ন রাষ্ট্রের মানদণ্ডও ঐ একটি - যার যার রাষ্ট্রের স্বার্থ। অন্য কোন মানবীয় অনুভূতির সেখানে কোন স্থান নেই। সুতরাং এই নীতিতে পৃথিবীতে শান্তি অসম্ভব।

বিশ্বের সর্ববৃহৎ যীশু খ্রিস্টের ভাস্কর্য
বিশ্বের সর্ববৃহৎ যীশু খ্রিস্টের ভাস্কর্য

ধর্মকে জাতীয় জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করার আরও একটি সুদূরপ্রসারী ফল দেখা দিল। এর আগে রাজতন্ত্রকে ধর্মীয় অনুশাসন আংশিকভাবে হলেও নিয়ন্ত্রণ করত। ধর্মকে বিচ্ছিন্ন করার পর ঐ নিয়ন্ত্রণের অনুপস্থিতির কারণে রাজারা ক্রমেই স্বেচ্ছাচারী হয়ে উঠলেন এবং এটা বেড়ে যেয়ে এমন অবস্থা হয়ে উঠলো যে, দেখা গেল যে একে আর চলতে দেয়া যায় না। কারণ রাজতন্ত্র ধর্মহীন হয়ে স্বৈরতন্ত্রে পরিণত হয়েছে। 

এরপর এক এক করে রাজতন্ত্র ধসে পড়তে আরম্ভ করল এবং সে সব স্থানে স্থান করে নিল বিভিন্ন মতবাদ। কোথাও গণতন্ত্র, কোথাও সমাজতন্ত্র, কোথাও সাম্যবাদ, কোথাও একনায়কত্ব ইত্যাদি। দু’চারটি স্থানে রাজতন্ত্র টিকে থাকলেও কোনো না কোনো তন্ত্র বা বাদ তাদের হাত থেকে ক্ষমতা ছিনিয়ে নিয়ে তাদের ঠুঁটো জগন্নাথে পরিণত করল। 

এরপর অর্থাৎ রাজতন্ত্রের পতনের পর এলো আরেক পরিবর্তন। সেটা এই যে, ‘ধর্মনিরপে¶তা’ সৃষ্টি করে সাবভৌমত্ব আল্লাহর হাত থেকে নিয়ে রাজাদের হাতে দেয়া হয়েছিল, এবার তাদের হাত থেকে নিয়ে যেখানে একনায়কত্ব চালু হল সেখানে একনায়কের (Dictator)  হাতে, যেখানে সমাজতন্ত্র বা সাম্যবাদ (Communism)  চালু হল সেখানে সমাজের একটি বিশেষ শ্রেণির হাতে, যেখানে গণতন্ত্র চালু হল সেখানে জনগণের হাতে দেয়া হল। মানবজাতির ইতিহাসে এই প্রথম আল্লাহর সাবভৌমত্বকে অস্বীকার করে মানুষ তার জাতীয় জীবন-ব্যবস্থা, দীন, নিজেই তৈরি করে নেবার দায়িত্ব গ্রহণ করল। এই জন্য এই ঘটনাকে একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা যা মানুষের ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। 

ধর্মকে জাতীয় জীবন থেকে কেটে ব্যক্তিগত জীবনে আবদ্ধ করে রাখার ফল হয়ত এ আশা করা যেত যে জাতীয় জীবনে ন্যায়-অন্যায়ের মানদণ্ড না থাকায় সেখানে যত অন্যায়ই হোক ধর্মের প্রভাবে ব্যক্তি জীবনে মানুষ ন্যায়পরায়ণ ও মানবিক মূল্যবোধ পূর্ণ থাকবে। কিন্তু তাও হয় নি। কারণ মানুষের শিক্ষাব্যবস্থার ভার রইল ঐ ধর্মনিরপেক্ষ অর্থাৎ ধর্মহীন, ন্যায়-অন্যায় বোধহীন জাতীয় ভাগটার হাতে। সুতরাং অনিবার্য ফল স্বরূপ ব্যক্তিগত জীবন থেকেও ধর্মের প্রভাব আস্তে আস্তে লুপ্ত হয়ে যেতে শুরু করল। 

দার্শনিক, চিন্তানায়কগণ বলতে লাগলেন, ন্যায়-অন্যায় একটা আপেক্ষিক বিষয়, এর কোনো ধ্রুব মানদণ্ড নেই। সুতরাং নৈতিকতার বাঁধনটা ব্যক্তিজীবনেও শিথিল হয়ে গেল। স্রষ্টার দেয়া জীবন-বিধানে যে দেহ ও আত্মার ভারসাম্য ছিল তার অভাবে ঐ শিক্ষাব্যবস্থায় যে মানুষ সৃষ্টি হতে লাগলো তাদের শুধু একটি দিকেরই পরিচয় লাভ হল- দেহের দিক, জড়, স্থূল দিক, স্বার্থের দিক, ভোগের দিক। জীবনের অন্য দিকটার সাথে তাদের পরিচয় বিলুপ্ত হয়ে গেছে। 

অর্থাৎ ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ সৃষ্টি করে তা জাতীয় জীবনে প্রয়োগ করার ফলে শুধু জাতীয় জীবনই অন্যায়-অত্যাচার, অশান্তি ও রক্তপাতে পূর্ণ হয়ে যায় নি, যেখানে ধর্মকে টিকে থাকার অধিকার দেয়া হয়েছিল অর্থাৎ ব্যক্তি জীবনে, সেখানেও অধিকাংশ মানুষের জীবন থেকে ধর্ম বিদায় নিয়েছে, নিতে বাধ্য হয়েছে।