ফেসবুকে সামাজিক ব্যাধি ও সেলিব্রেটিদের বিড়ম্বনা

প্রকাশিত: আগস্ট ১৪, ২০২১
আমাদের দেশে ইদানীং সংস্কৃতিজগতের সেলিব্রেটিরা তাদের অধিকাংশ ফ্যান-ফলোয়ার কর্তৃক বেশ বিব্রতকর পরিস্থিতির শিকার হচ্ছে, যেটা অন্যান্য দেশে প্রায় অকল্পনীয়। ভয়ানক বিষয় হলো, দিনে দিনে এই তীব্রতা আক্রমণাত্মক হয়ে উঠছে। বিশেষ করে সেলিব্রেটিদের ব্যক্তিগত জীবনের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে এরা আক্রমণ করে থাকে। যেমন- একাধিক বিয়ে, ডিভোর্স, প্রেম, তাদের লাইফস্টাইল ইত্যাদি। এর জবাবে পাল্টা পোস্ট দেয়া ছাড়া আর সেলিব্রেটিরা কিইবা করতে পারে! 

ফেসবুকে সামাজিক ব্যাধি


নিঃসন্দেহে এটা একটা সামাজিক ব্যাধি। কিন্তু এই সামাজিক ব্যাধি ক্রমান্বয়ে রাষ্ট্রীয় ব্যাধিতে পরিণত হচ্ছে। তার প্রমাণ হলো - বাংলাদেশ-অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট সিরিজে অস্ট্রেলিয়ার পরাজয়ের পর, তাদের দেশের পেইজগুলোতে গিয়ে আক্রমণাত্মক, হিংস্রাত্মক কমেন্টস করা। 

এই সামাজিক ব্যাধির উৎপত্তিটা ঠিক কোথায়? 

আপনি যদি খুব ভালোভাবে চিন্তা করেন, তাহলে দেখতে পাবেন এর গোড়াতে রয়েছে - দ্বৈতচরিত্র (হিপোক্রেসি)। 

মানুষগুলো এখন বাইরে থেকে ভালোমানুষ সাজে কিন্তু ভেতরে তার সম্পূর্ণ উল্টো। আর ফেসবুক এই ভালোমানুষি প্রকাশটা খুব সহজ করে দিয়েছে। ছোটবেলা থেকেই দেখতাম মিডিয়ার সেলিব্রেটিদের অধিকাংশ সাধারণ মানুষগুলো খুব ভালো চোখে দেখে না এবং নিজেদের মধ্যে সমালোচনা করতো - জাহান্নামে যাবে, বিয়েশাদির ঠিক নাই, হেনতেন... কিন্তু তাদের প্রদেয় বিনোদন ঠিকই গিলতো। তখন এতটা সুযোগ ছিলো না তাদের সেই ভালোমানুষি প্রকাশ করার, এখন যেটা ফেসবুকের বদৌলতে হয়েছে।

কি নিদারুণ পরিস্থিতি বলতে গেলে! যে সেলিব্রেটির একটা অটোগ্রাফ পেতে ফ্যানদের লাইনের পরে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হতো, এখন সেই সেলিব্রেটিদের মুখোমুখি করে দিয়েছে তাদের সেই ফ্যানদের সাথে। এই সহজলভ্যতা অধিকাংশক্ষেত্রেই সেলিব্রেটিদের জন্য অসুবিধাই এনে দিয়েছে। ইচ্ছে করলে অফিসিয়াল পেজে গিয়ে কমেন্ট করা যায়, মেসেজ করা যায়।

এতো গেলো সেলিব্রেটিদের বিষয়। এখন আসি নিজেদের ক্ষেত্রে। ফেসবুক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে খুব সহজেই একটা মানুষকে কষ্ট দেয়া যায়, বিব্রতকর পরিস্থিতে ফেলা যায়। সহজ বললাম একারণে, যে মানুষটাকে আপনি ঠিকমত চিনেন না, আপনি চাইলে তার একটা সিরিয়াস পোস্টে গিয়ে ইচ্ছে করে হাহা রিয়েক্ট দিয়ে বসে থাকলেন। অথচ সেই পোস্টটা কোনভাবেই হাসির না। আপনার হা হা রিয়েক্ট দেয়ার অর্থ হলো আপনি তাকে বিদ্রুপ করলেন, ঠাট্টা করলেন অর্থ্যাৎ তাকে হেয় প্রমাণ করতে চাচ্ছেন। হ্যা, আপনার মতের অমিল থাকতেই পারে কিন্তু তাই বলে আমরা আরেকজনকে বিদ্রুপ করতে পারি না। 

অর্থ্যাৎ, আমরা এখন আর হিপোক্রেসির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। ইতিহাসে দেখা যায়, হিপোক্রেটরা সাধারণত ভীতু হয়ে থাকে। কিন্তু এখন এই হিপোক্রেটরা আক্রমণাত্মক হয়ে গেছে। এর কারণ, শিয়াল একা একা ভীতু আর দলে মিলে হয় হিংস্রাত্মক। ঠিক তেমনি এই হিপোক্রেটদের সংখ্যা বেড়ে গেছে। খুব যে বেড়ে গেছে, সেটাও না। তারা আগেও ছিলো। কিন্তু ফেসবুক প্ল্যাটফর্মে তাদের এক্টিভিটি কম ছিলো। এখন তাদের সমমনা বেড়েছে, বেড়েছে সাহস। 

এই সামাজিক ব্যাধি থেকে উত্তোরণের উপায় কী?

আপাতদৃষ্টিতে সমাধান হলো - এদের আসল পরিচয়টা চেনা (আশা করি এই পোস্টটা পড়ার পর এদেরকে চিনতে পেরেছেন) আর তাদের এক্টিভিটি পাত্তা না দেয়া। আইনিভাবে সমাধান নেই। কয়জনের বিরুদ্ধে লড়বেন! আর এর বাইরে গিয়ে এই সামাজিক ব্যাধির বিরুদ্ধে লড়াই করা। 

আর স্থায়ীভাবে সমাধান হলো - মননে-চিন্তায় জাতিগত উৎকর্ষ, উত্তোরণ; যেটা বেশ সময়সাপেক্ষ কিন্তু এটাকেই মূল লক্ষ্য রেখে এগুতে হবে। নইলে সব চলে যাবে নষ্টদের দখলে।

প্রত্যাশায় - পৃথিবীটা ভালোদের হোক।