ইলাহর প্রকৃত অর্থ ও তওহীদ যে অর্থে জান্নাতের চাবি

প্রকাশিত: অক্টোবর ১৩, ২০২১
ইলাহর প্রকৃত অর্থ ও তওহীদ যে অর্থে জান্নাতের চাবি

আরবি 'ইলাহ' ( آلهة, eng.Ilah) শব্দটির প্রকৃত অনুবাদ খুঁজতে গিয়ে যা পেলাম, তার সংক্ষেপ হলো - কেউ অর্থ করেছেন রব, মাবূদ, এক আল্লাহ, সৃষ্টিকর্তা ইত্যাদি। বিশারদগণ ব্যকরণগত, অলংকারগত অনেক বকবক করেছেন; তাফসীর করেছেন; পারলে পুরো এক প্রবন্ধ লিখেছেন কিন্তু 'ইলাহ'-র সুনির্দিষ্ট অর্থ বলতে পারেননি। তবে আশার বিষয় হলো, অনেক ইসলামী পন্ডিত 'ইলাহ' কে 'আল্লাহর একক সার্বভৌমত্ব' এর সমার্থক বলতে পেরেছেন। আর কোরআন ও হাদিসে এ বিষয়ে বিস্তারিত পড়ার পর আমার কাছে এটাই সঠিক মনে হয়েছে।  

এই লেখায় মূলত আমি আমার স্বল্পজ্ঞানে রেফারেন্স, যুক্তি-প্রমাণসহকারে আরবি 'ইলাহ' নিয়ে আলোচনা করবো। আশা করি, লেখা পড়ে আপনিও সম্মত হবেন। না হলে কমেন্টে জানাবেন। 

আরবি 'ইলাহ' শব্দের অর্থ কী?

আরবি 'ইলাহ' শব্দের অর্থ হলো -  একক সার্বভৌমত্ব (Sovereignty, Supreme Authority)। এই ইলাহ-ই মূলত আল্লাহর পরিচয়, ক্ষমতাকে সবচেয়ে ভালোভাবে বর্ণনা করে।  কারণ, আল্লাহকে যখন খালিক, রাজ্জাক, মালিক, রব, মাবূদ ইত্যাদি নামে ডাকা হয়; তখন মূলত আল্লাহর নির্দিষ্ট একটা গুণকে বর্ণনা করা হয়। কিন্তু আল্লাহকে যখন 'ইলাহ' বলা হয়, তখণ আল্লাহর সামগ্রিক পরিচয় ও ক্ষমতা বুঝানো হয়। 

ইলাহ শব্দের সমার্থক শব্দ কেনো রব, মাবূদ, উপাস্যকারী নয়?

রব (প্রতিপালক), মাবূদ (উপাস্যকারী) - প্রতিটা নামই আল্লাহর বিশেষ গুণ বা ক্ষমতাকে বুঝাতে ব্যবহৃত হয় কিন্তু আল্লাহর সামগ্রিক পরিচয় ও ক্ষমতা বুঝাতে ব্যর্থ। 

যদি ধরেও নিই, এগুলো ইলাহ শব্দের সমার্থক আরবি শব্দ; মহান আল্লাহ কিন্তু কোরআনের কোথাও ইলাহ শব্দের পরিবর্তে রব বা মাবূদ ব্যবহার করেন নি। 

উদাহরণ: কোরআনে 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বাক্যাংশটি অনেকবার এসেছে। এই বাক্যাংশে তিনি একটিবারের জন্যও ইলাহ-র পরিবর্তে অন্য কোন আরবি শব্দ ব্যবহার করেন নি। তিনি বলেন নি - লা মাবূদ ইল্লাল্লাহ বা লা রব ইল্লাল্লাহ। আবার আমরা যদি সহিহ হাদিসগুলোতে দেখি, সেখানে রাসূল সা. কখনোই ইলাহ শব্দের পরিবর্তে অন্য কোনো আরবি শব্দ ব্যবহার করেন নি। 

এ থেকে অন্তত একটা বিষয় স্বচ্ছ (Crystal Clear) যে, আরবি ইলাহ শব্দের সমার্থক শব্দ মাবূদ বা রব নয়। 

কোরআনে আল্লাহ 'ইলাহ' শব্দটিকে কোন অর্থে ব্যবহার করেছেন?

ইতিাহসে আমরা পাই, মিশরের ফারাও রাজ্যে মূলত আমুন খোদা ও হরাস, অসিরিসি, রা, বাস্তেত প্রভৃতি দেবদেবীর উপাসনা করা হতো। ফেরাউনকে যখন মূসা আ. তওহীদ তথা আল্লাহকে এক ইলাহ হিসেবে মেনে নেয়ার আহ্বান করলো, ফেরাউন তখন বলেছিলো - 

"তুমি যদি আমার পরিবর্তে অন্যকে ইলাহ হিসেবে কবুল করো, তবে আমি তোমাকে অবশ্যই কারারুদ্ধ করবো।" [সূরা শুআরা, আয়াত ২৯]

অথচ ফেরাউনের বলার কথা ছিলো, "তুমি যদি  আমুন খোদা/ হরাস/অসিরিসি/রা/বাস্তেত-এর পরিবর্তে অন্যকে ইলাহ হিসেবে কবুল করো, তবে আমি তোমাকে অবশ্যই কারারুদ্ধ করবো।"

কিন্তু ফেরাউন তা বলেনি। কারণ, ফেরাউন ও তখনকার অধিবাসীরা স্পষ্টতই জানতো, আমুন খোদা, হরাস, অসিরিসি, রা, বাস্তেত ইত্যাদি দেবদেবী প্রত্যেকেই বিশেষ গুণ বা ক্ষমতার অধিকারী কিন্তু সামগ্রিক ক্ষেত্রে (ফেরাউনের বেলায় রাজ্য পরিচালনার হুকুমদাতা) ইলাহ নয়।  

এখানে ফেরাউন আমুন খোদা ও অন্যান্য দেবদেবীর পরিবর্তে নিজেকেই ইলাহ হিসেবে দাবি করছে। কারণ, ফেরাউন সেই রাজ্যের সকল আইনের সার্বভৌমত্বের অধিকারী বা ইলাহ। তার হুকুম অনুযায়ীই রাজ্য চলে। সেখানে আল্লাহকে যদি ইলাহ হিসেবে মেনে নেয় তার মানে এরপর থেকে মূসা আ. এর আল্লাহর ঐশীবাণী অনুযায়ী সেই রাজ্য পরিচালনা হবে আর এটাই ফেরাউন মেনে নিতে নারাজ ছিলো।

আল্লাহ কোরআনে বলেন, দুই ইলাহ গ্রহণ করো না। ইলাহ তো কেবল একজনই। সুতরাং তোমরা কেবল আমাকেই ভয় করো। [সূরা নহর, আয়াত ৫১]

অর্থ্যাৎ মানুষ চাইলে তার অজ্ঞতার জন্য এক বা একাধিক ইলাহ গ্রহণ করতে পারে। যেমন- তৎকালীন আরবের মুশরিকরা একাধিক ইলাহ গ্রহণ করেছিলো অথবা আল্লাহর সাথে বিভিন্ন দেবদেবীদের শরিক করে আল্লাহকে ইলাহ হিসেবে অস্বীকার করেছিল। বিভিন্ন ক্ষমতার জন্য তারা বিভিন্ন দেবদেবী বা উপাস্যের উপাসনা/ইবাদত করেছে, তাদেরকে গ্রহণ করেছে। এই বিষয়টা স্বয়ং আল্লাহ প্রিয় রাসূল সা. কে সুন্দরভাবে বুঝিয়ে দিয়েছেন। যেমন - 

আল্লাহ রাসূল সা. কে লক্ষ্য করে কোরআনে বলেন - 

১. "যদি আপনি তাদেরকে জিজ্ঞাসা করেন, কে তাদেরকে সৃষ্টি করেছেন, তবে অবশ্যই তারা বলবে, আল্লাহ, অতঃপর তারা কোথায় ফিরে যাচ্ছে ? [সুরা যুখরুফঃ ৮৭] 

২. "যদি আপনি তাদেরকে জিজ্ঞেস করেন, কে নভোমন্ডল ও ভূ-মন্ডল সৃষ্টি করেছে, চন্দ্র ও সূর্যকে কর্মে নিয়োজিত করেছে? তবে তারা অবশ্যই বলবে আল্লাহ। [সুরা আনকাবুতঃ ৬১]

৩. "যদি আপনি তাদেরকে জিজ্ঞেস করেন, কে আকাশ থেকে বারি বর্ষণ করে, অতঃপর তা দ্বারা মৃত্তিকাকে উহার মৃত হওয়ার পর সঞ্জীবিত করে? তবে তারা অবশ্যই বলবে, আল্লাহ। বলুন, সমস্ত প্রশংসা আল্লাহরই। কিন্তু তাদের অধিকাংশই তা বোঝে না। [সুরা আনকাবুতঃ ৬৩]

৪. "বলুন পৃথিবী এবং পৃথিবীতে যারা আছে, তারা কার? যদি তোমরা জান, তবে বল। এখন তারা বলবেঃ সবই আল্লাহর। বলুন, তবুও কি তোমরা চিন্তা কর না? বলুনঃ সপ্তাকাশ ও মহা-আরশের মালিক কে? এখন তারা বলবেঃ আল্লাহ। বলুন, তবুও কি তোমরা ভয় করবে না? বলুনঃ তোমাদের জানা থাকলে বল, কার হাতে সব বস্তুর কর্তৃত্ব, যিনি রক্ষা করেন এবং যার কবল থেকে কেউ রক্ষা করতে পারে না ? এখন তারা বলবেঃ আল্লাহর।  [সুরা মু'মিনুনঃ ৮৪-৮৯]

৫. তুমি জিজ্ঞেস কর, কে রুযী দান করে তোমাদেরকে আসমান থেকে ও যমীন থেকে, কিংবা কে তোমাদের কান ও চোখের মালিক? তাছাড়া কে জীবিতকে মৃতের ভেতর থেকে বের করেন এবং কেইবা মৃতকে জীবিতের মধ্য থেকে বের করেন? কে করেন কর্ম সম্পাদনের ব্যবস্থাপনা? তখন তারা বলে উঠবে, আল্লাহ! তখন তুমি বলো তারপরেও ভয় করছ না? [সুরা ইউনুসঃ ৩১]

এরকম আরো অনেক আয়াত আছে, যেগুলোতে প্রমাণিত হয়, তৎকালীন আরববাসী আল্লাহকে সৃষ্টিকর্তা (খালিক), পালনকর্তা (রব), রিযিকদাতা (রাজ্জাক), মালিক ইত্যাদি হিসেবে বিশ্বাস করতো। 

আবার ইতিহাসেও দেখতে পাই, আরবের অধিবাসীরা রাসূল সা. এর আগমনের আগেই যেকোন ভালো কাজের শুরুতে 'বিসমিল্লাহ' ব্যবহার করতো, নাম রাখতো আব্দুল্লাহ - যেগুলোতেও ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত হয় তারা আল্লাহকে অনেক ক্ষেত্রেই মানতো।[Gerhard Böwering, God and his Attributes, Encyclopedia of the Qur'an, ed. by Jane Dammen McAuliffe]

তাসত্ত্বেও, সেই আরববাসীর কাছে রাসূল সা. কে কেনো তওহীদের দাবি - লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ নিয়ে যেতে হলো? তাসত্ত্বেও কেনো আল্লাহ সেই আরববাসীদের মুশরিক, কাফির বললেন? 

এর কারণ একমাত্র এটাই হতে পারে যে, তৎকালীন আরবের অধিবাসীরা ওসব ক্ষেত্রে আল্লাহকে মানলেও ব্যক্তি, সমাজ, অর্থনীতি, যুদ্ধ ইত্যাদি পরিচালনায়, বিচার-ফায়সালায় বিভিন্ন দেবদেবীদের শরণাপন্ন হতো। সেক্ষেত্রে আল্লাহকে উপেক্ষা করে ঐসব দেবদেবীদের উপাসনা করা হতো, কখনোবা নিজেদের তৈরিকৃত প্রথা বা নিয়ম দেবদেবীদের নামে চালিয়ে সাধারণ মানুষদের শোষণ করা হতো। 

যেমন - আল-লাত (আরবি: اللات‎‎) হলো পাতালের দেবী। আল-উজ্জা (আরবি: العزى‎‎, অর্থাৎ ‘সর্বশক্তিময়ী’) ছিলো আরবের উর্বরতার দেবী। যুদ্ধে রক্ষা ও জয়ের জন্য তার কাছে প্রার্থনা করা হত। মনাত (আরবি: مناة‎‎) ছিলো ভাগ্যের দেবী। 

যারা সম্পূর্ণরূপে পৌত্তালিকতাকে গ্রহণ করেছিলো, তারাই হলো কাফের আর যারা আল্লাহকে কিছুক্ষেত্রে মানতো আর কিছুক্ষেত্রে মানতো না, তারাই ছিলো মুশরিক। 

পৌত্তালিকতা যখন প্রায় সম্পূর্ণরূপে আরববাসীকে গ্রাস করে, আরববাসীদের কাছে আল্লাহসত্তা অনেকটাই গুরুত্বহীন হয়ে যায়। ঠিক এসময়েই আল্লাহ সেখানে রাসূল সা. কে পাঠান। 

একমাত্র আল্লাহকে সর্বক্ষেত্রে একক সার্বভৌমের অধিকারী তথা ইলাহ হিসেবে নতুনভাবে পরিচয় করিয়ে দেয়ার জন্য ঐ তওহীদের দাবি তুলে ধরতে হয়েছিলো। আর এই কাজটা শুধু রাসূল সা.-ই করেন নি। 

পূর্বোক্ত যত নবী-রাসূল এসেছিলেন, তারা প্রত্যেকেই স্বজাতিরে সামনে 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ'-এর দাবি তুলে ধরেছেন। 

ইহুদি ও খৃষ্টানদের ব্যাপারে আল্লাহ স্মরণ করিয়ে দেন, তারা আল্লাহর পরিবর্তে নিজেদের ওলামা ও পাদ্রীদেরকে তাদের রব বানিয়ে নিয়েছে। মসীহ ইবনে মরিয়ামকেও রব বনিয়েছে। অথচ তাদেরকে বেবল এক ইলাহর ইবাদাতের নির্দেশ দেয়া হয়েছিলো, তিনি ভিন্ন আর কোন ইলাহ নেই। [সূরা তওবা, আয়াত ৩১]

আল্লাহ বলেন, আমি তোমার আগে এমন কোন রাসূল প্রেরণ করিনি তার প্রতি এই ওহি ব্যতীত যে - লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ; সুতরাং আমারই ইবাদত করো। [সূরা আম্বিয়া, ২৫ নং আয়াত]

এখান থেকে স্পষ্টত যে, আল্লাহকে ইলাহ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেয়ার জন্য বারবার মানবজাতির সামনে আসতে হয়েছে নবী-রাসূলদের। কারণ, সময়ের ব্যবধানে মানুষ আল্লাহর এই পরিচয় ভুলে গিয়েছিলো। 

তওহীদ যে অর্থে জান্নাতের চাবি

লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ তথা তওহীদ জান্নাতের চাবি - একাধিক সহিহ হাদিস থাকা সত্ত্বেও যখন একথা মুসলিমদের সামনে উত্থাপন করা হয় অধিকাংশরাই ভ্রু কুঁচকে ফেলেন অথবা বিশ্বাসই করতে চান না। তারা ভাবেন যে জান্নাতে যাওয়া এতই সোজা? এ ব্যাপারে বলার আগে তন্মধ্যে কিছু হাদিস এখানে উল্লেখ করা হলো - 

১. উবাদা (রাঃ) সূত্রে নবী‎ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে বর্ণিতঃ

তিনি বলেন, যে ব্যক্তি সাক্ষ্য দিল, আল্লাহ্‌ ব্যতীত আর কোন ইলাহ নেই, তিনি একক, তাঁর কোন শরীক নেই আর মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর বান্দা ও রসূল আর নিশ্চয়ই ‘ঈসা (‘আঃ) আল্লাহ্‌র বান্দা ও তাঁর রাসূল এবং তাঁর সেই কালিমাহ যা তিনি মারইয়ামকে পৌঁছিয়েছেন এবং তাঁর নিকট হতে একটি রূহ মাত্র, আর জান্নাত সত্য ও জাহান্নাম সত্য আল্লাহ্‌ তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন, তার ‘আমল যাই হোক না কেন। ওয়ালীদ (রহঃ).....জুনাদাহ (রহঃ) হতে বর্ণিত হাদীসে জুনাদাহ অতিরিক্ত বলেছেন যে, জান্নাতে আট দরজার যেখান দিয়েই সে চাইবে। [মুসলিম ১/১০ হাঃ ২৮, আহমাদ ২২৭৩৮ (বুখারী, আধুনিক প্রকাশনীঃ ৩১৮১, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৩১৯০)]

২. রাসূল সা. জনৈক মুয়াযযিনকে বলতে শুনলেন: «أشهد أن لاإله إلاالله» (আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া সত্য কোনো ইলাহ নেই)। তিনি বললেন: «خَرَجَ مِنَ النَّارِ» “সে জাহান্নাম থেকে মুক্তি পেল”। [সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৩৮২]

৩. উসমান (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, “যে ব্যক্তি ‘আল্লাহ ছাড়া কেউ সত্য ইলাহ নেই’ এ কথা জানা অবস্থায় মারা যাবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।” (মুসলিম ১৪৫, আহমাদ ৪৬৪নং)

৪. মুআয বিন জাবাল (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, “যার শেষ কথা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ হবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।” (আহমাদ ২২০৩৪, ২২১২৭, আবূ দাঊদ ৩১১৮, হাকেম ১২৯৯, সহীহুল জামে’ ৬৪৭৯নং)

৫. ওয়াহব ইবনু মুনাব্বিহ (রহঃ) থেকে বর্ণিতঃ তাকে জিজ্ঞেস করা হল, “লা-ইলা-হা ইল্লাল্লা-হ” (আল্লাহ্ ছাড়া প্রকৃত কোন ইলাহ নেই)-এ বাক্য কি জান্নাতের চাবি নয়? ওয়াহব বললেন, নিশ্চয় (এটা চাবি)। কিন্তু প্রত্যেক চাবির মধ্যেই দাঁত থাকে। তুমি যদি দাঁতওয়ালা চাবি নিয়ে যাও তবেই তো তোমার জন্য (জান্নাতের দরজা) খুলে দেয়া হবে, অন্যথায় তা তোমার জন্য খোলা হবে না। [সহীহ: ফাতহুল বারী ১/৪১৭; ইমাম বুখারী হাদীসটি সানাদ ছাড়াই উল্লেখ করেছেন]

উপরোক্ত হাদিসগুলো প্রমাণ করে জান্নাতের যাবার মূলশর্ত হলো - তওহীদের সাক্ষ্য দেয়া। লেখার এ পর্যন্ত এসে হয়তো একটা বিষয় পরিষ্কার হয়েছে, আমরা বর্তমান মুসলিম জাতি তওহীদের সাক্ষ্য তথা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ যে অর্থে বলি, সেটা সম্পূর্ণ হয় না। মানে 'ইলাহ'র অর্থ যখন আমরা মাবুদ বা উপাস্য অর্থে ব্যবহার করি, তখন এটা মেনে নিতে কষ্ট হয় যে - লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বললেই জান্নাতে যাওয়া যাবে! এতই সহজ! 

কিন্তু যখন আমরা ইলাহ'র প্রকৃত অর্থ জানবো, তখন এই ঘোষণা দেয়া পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন কাজ। কারণ, আপনি এই ঘোষণার মাধ্যমে আপনার ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে সামাজিক-রাষ্ট্রীয়-আন্তর্জাতিক, ইহলৌকিক, পারলৌকিক সকল ক্ষেত্রে একমাত্র আল্লাহকে একক সার্বভৌমের স্বীকার করছেন। যেখানে আল্লাহর হুকুম-বিধান আছে, সেখানে আর কারো হুকুম-বিধান মানা যাবে না। এরচাইতে কঠিন কাজ কি হতে পারে?

আবার এই সাক্ষ্য দিয়েই শুধু বসে থাকলে চলবে না, আমরণ আপনাকে এটার উপর বিশ্বাস ও আমল রাখতে হবে। সেই আমলের মধ্যে আল্লাহকে সকল ক্ষেত্রে আদেশদাতা হিসেবে মানতে হবে, হোক তা সালাহ-যাকাহ পালনে, হোক তা সামাজিক-রাষ্ট্রীয় পরিচালনা নীতিতে।