নির্বাচিত লেখা

দক্ষিণ এশিয়ায় ধর্মান্ধতার উত্থান: বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আমাদের করণীয়

জাতীয় প্রেসক্লাবের সন্নিকটে বাগিচা চাইনিজ রেস্টুরেন্টে হেযবুত তওহীদ ঢাকা মহানগর গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বদেরকে নিয়ে একটি গোলটেবিল বৈ......

নোয়াখালীতে হেযবুত তওহীদের উপর পৈশাচিক হত্যাযজ্ঞ বিশ্লেষণ

প্রকাশিত: অক্টোবর ১৯, ২০২১
নোয়াখালীতে হেযবুত তওহীদের উপর পৈশাচিক হত্যাযজ্ঞ বিশ্লেষণ

তারিখ: ২০১৬ সালের ১৪ই মার্চ।

স্থান: নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী উপজেলার পোরকরা গ্রাম। হেযবুত তওহীদের এমাম জনাব হোসাইন মোহাম্মদ সেলিমের বাড়ি।

ঘটনা: মসজিদের মাইকে হেযবুত তওহীদকে খ্রিস্টান বলে গুজব রটিয়ে হামলা।

হামলায় অংশগ্রহণকারী ও ইন্ধনদাতা:

১. স্থানীয় ধর্মভিত্তিক দলের নেতা-কর্মীরা, 

২. বহিরাগত কওমী মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষকরা, 

৩. আশেপাশের মসজিদ ও মাদ্রাসার ধর্মীয় নেতারা ও তাদের মিথ্যা প্রচারণায় প্রভাবিত ধর্মান্ধ অনুসারীরা।

৪. স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা। (যথাসময়ে ব্যবস্থা না নিয়ে ঘটনা ঘটতে দিয়েছে)

৫. স্থানীয় কিছু আওয়ামী নেতা। (রাজনৈতিক স্বার্থে পরোক্ষভাবে ইন্ধন দিয়েছে)

হামলার আগে যা হয়েছিল:

১. কয়েক সপ্তাহ ধরে এলাকায় হেযবুত তওহীদের বিরুদ্ধে মিথ্যাচারে ভরা বেনামী হ্যান্ডবিল বিতরণ করেছে ধর্মব্যবসায়ী গোষ্ঠী।

২. অনলাইনে অফলাইনে একের পর এক হুমকি।

৩. আশেপাশের মসজিদের ইমাম ও খতিবরা জুমার নামাজে মিথ্যা হ্যান্ডবিল ব্যবহার করে ধর্মান্ধদেরকে উসকানি দিয়েছে।

৪. পরিস্থিতি আঁচ করতে পেরে হেযবুত তওহীদ বারবার প্রশাসনকে জানিয়েছে, এসপি ও ডিসির কাছে স্মারকলিপি দিয়েছে, হামলার আশঙ্কা প্রকাশ করেছে। কিন্তু প্রশাসন চিহ্নিত উস্কানিদাতাদেরকে গ্রেফতার করেনি।

হামলার দিন হেযবুত তওহীদ যা করছিল:

১. হেযবুত তওহীদের এমামের বাড়ির আঙ্গিনায় একটি মসজিদ নির্মাণের কাজ চলছিল। হেযবুত তওহীদের সদস্যরা এই মসজিদে স্বেচ্ছাশ্রম দিচ্ছিলেন।

২. বাড়িতে মেয়েরা রান্নাবান্নার কাজে ব্যস্ত ছিল।

হামলার ঘটনাক্রম:

১. সকাল থেকেই হেযবুত তওহীদের বিরুদ্ধে উস্কানিমূলক মিছিল শুরু করে ধর্মব্যবসায়ী গোষ্ঠী। 

২. আশেপাশের মসজিদের মাইকে ঘোষণা দেওয়া হয়- হেযবুত তওহীদ খ্রিস্টান, তারা বাড়িতে গির্জা বানাচ্ছে। 

৩. মাইকে স্লোগান দেওয়া হয়- খ্রিস্টান মারো গির্জা ভাঙো। সকাল দশটার মধ্যে হামলা শুরু।

৪. হাজার হাজার ধর্মান্ধ একযোগে হামলা চালিয়ে গুড়িয়ে দেয় হেযবুত তওহীদের নির্মাণাধীন মসজিদ। 

৫. হেযবুত তওহীদের এমামের বাড়ি ও তার পাশেপাশের হেযবুত তওহীদের সদস্যদের বাড়িতে একের পর এক চলতে থাকে লুটপাট। লক্ষ লক্ষ টাকার জিনিসপত্র লুটপাটের পর শুরু হয় অগ্নিসংযোগ। আটটি বাড়ি আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়।

৬. এদিকে হেযবুত তওহীদের সদস্যদেরকে যেখানেই পায় লাঠি, দা, কিরিচ, পাথর দিয়ে আঘাত করতে থাকে।

৭. উপস্থিত ছিল ১১৬ জন হেযবুত তওহীদের সদস্য। তাদের মধ্যে ১১৪ জনকে গুরুতর যখম করে, অনেকের হাত পা কেটে ফেলে। আর বাকি দুইজন সদস্যকে জবাই করে হত্যা করে। হত্যার আগে ছুরি দিয়ে চোখ উপড়ে নেয়। হাত পায়ের রগ কেটে ফেলে। হত্যার পর লাশে পেট্রোল ঢেলে আগুন জ্বালিয়ে দেয়। 

৮. হত্যাকাণ্ডের ছবি ফেসবুকে পোস্ট করে তারা লিখতে থাকে- নোয়াখালীতে খ্রিস্টানদের সাথে যুদ্ধ হচ্ছে, দুইজন খ্রিস্টানকে খতম করেছি, ইসলামের জন্য যুদ্ধ করতে পেরে আমরা অনেক খুশি। চার ঘণ্টা ধরে তাদের তাণ্ডব চলছিল- কিন্তু পুলিশ তখনও ঘটনাস্থলে আসেনি। অথচ হামলার আশঙ্কা করে বহু আগে থেকেই দফায় দফায় পুলিশকে জানানো হয়েছে।

৯. চার ঘণ্টা পর পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয়। পুলিশের সামনেই বীরদর্পে ঘুরে বেড়াতে থাকে হামলাকারীরা। পুলিশ হেযবুত তওহীদের সদস্যদেরকে আহত-রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধারের চেষ্টা করে।

১০. হেযবুত তওহীদের সদস্যদেরকে বাড়ি থেকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়ার সময় রাস্তায় পুলিশের গাড়িতে আবারও আক্রমণ করে হামলাকারীরা। 

১১. হেযবুত তওহীদের সদস্যদেরকে উদ্ধার করায় ক্ষিপ্ত হয়ে রাত দশটায় থানাতেও আক্রমণ চালায় ধর্মব্যবসায়ী গোষ্ঠী ও তাদের অনুসারীরা।

মিডিয়ার ভূমিকা কী ছিল:

১. মিডিয়া এতবড় বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডকে বলতে গেলে এড়িয়ে গেছে।

দায়সারা গোছের কিছু নিউজ তারা করেছে, যেটাতে হামলার ঘটনাকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। হেযবুত তওহীদের সাথে গ্রামবাসীর সংঘর্ষ বলে চালানো হয়েছে।

২. দ্বিতীয়ত মিডিয়া চেষ্টা করেছে এই ঘটনাকে মতাদর্শিক সংঘর্ষ বলে চালিয়ে দিতে। অথচ এই ঘটনাটি মতাদর্শিক বিষয় ছিল না। বহু হামলাকারী হেযবুত তওহীদের নামটাও জানত না। তারা এসেছিল খ্রিস্টান হত্যা করতে ও গির্জা ভাঙতে। 

মানবাধিকার সংগঠনের ভূমিকা:

১. নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছে দেশের মানবাধিকার সংগঠনগুলো। 

২. জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ঘটনাস্থল পরিদর্শন করবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তিনিও পরিদর্শনে যাননি।

অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের ভূমিকা:

১. অন্যান্য ধর্মাবলম্বীরাও নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছে। এদেশে কোনো সাম্প্রদায়িক হামলা হলেই বিভিন্ন সংখ্যালঘু দল, সংগঠনকে হামলার প্রতিবাদ করতে দেখা যায়। অথচ খ্রিস্টান বলে গুজব রটিয়ে হেযবুত তওহীদের দুইজন সদস্যকে পৈশাচিক কায়দায় হত্যার ঘটনায় একটি সংগঠনকেও কথা বলতে দেখা যায়নি।

জনপ্রতিনিধিদের ভূমিকা:

১. ভিক্টিম ব্লেমিং এর চেষ্টা করেছে অনেক জনপ্রতিনিধি। তারা বলার চেষ্টা করেছে- হেযবুত তওহীদ আলেম ওলামাদের কথামতো সঠিকভাবে ইসলাম চর্চা করে না, হেযবুত তওহীদ ইসলামের উল্টাপাল্টা ব্যাখ্যা দেওয়ার কারণেই জনগণ ক্ষিপ্ত হয়ে হামলা করেছে। অথচ জনগণ হামলা করেনি, হামলা করেছিল কারা তা একটু আগে বলা হয়েছে। আর বড় কথা হলো- হামলাটা হয়েছে খ্রিস্টান বলে গুজব রটিয়ে। কাজেই হেযবুত তওহীদকে নয়, ধর্মান্ধরা খ্রিস্টানকে হত্যা করতে চেয়েছিল।

২. জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে অনেকের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ইন্ধন ছিল এই হামলায়। 

হামলার পর:

১. হেযবুত তওহীদের সদস্যদেরকেই আসামী করে মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়েছিল- যা পরবর্তীতে মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। 

২. ঘটনার দিন পুলিশ বাদী হয়ে যে মামলাটি করেছিল সেটা আড়াই বছর পর চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। কিন্তু নির্বাচনকে সামনে রেখে উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে মামলাটিকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করা হয়। বহু আসামীকে এই মামলায় অভিযুক্ত করা হয় যারা ওই ঘটনায় সম্পৃক্ত নয়, অন্যদিকে বহু খুনের আসামীকেও অভিযুক্ত করা হয় নাই। তাছাড়া রাজনৈতিক মামলা হিসেবে পরিগণিত হওয়ায় মামলাটি অত্যন্ত দুর্বল হয়ে যায় এবং সহজেই খুনের আসামীরা জামিন পেয়ে এলাকা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। আবারও হুমকি ধামকি দিচ্ছে।

সার্বিক বিশ্লেষণ

১. এটা স্পষ্ট যে, বর্বরোচিত হামলাটি ছিল সাম্প্রদায়িক হামলা। হেযবুত তওহীদকে খ্রিস্টান বলে গুজব রটানো হয়েছিল। তার মানে হামলাকারী ধর্মান্ধরা মনে করেছিল তারা খ্রিষ্টানদেরকে হত্যা করছে, খ্রিস্টানদের উপাসনালয় ভাঙছে, খ্রিস্টানদের বাড়িঘর লুট করছে ও আগুন দিচ্ছে। 

২. হেযবুত তওহীদ খ্রিস্টান নয়, কিন্তু বাংলাদেশে খ্রিস্টান সম্প্রদায় রয়েছে। আরও রয়েছে হিন্দু ও বৌদ্ধ সম্প্রদায়। সোনাইমুড়ীর হামলাটি ছিল বাংলাদেশের জন্য অশনিসংকেত। কিন্তু দুঃখজনকভাবে এতবড় হামলার ঘটনাটি দেশের মিডিয়া, মানবাধিকার সংগঠন, সুশীল শ্রেণি সবাই এড়িয়ে গেছেন। সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে যারা কাজ করেন- তাদের নীরবতা ছিল হৃদয়বিদারক!

৩. হেযবুত তওহীদের উপর হামলার ঘটনায় অনেকেই মনে করেছেন এই হামলার বিরুদ্ধে কথা বললে হেযবুত তওহীদকে সমর্থন করা হয়ে যাবে। তাই চুপ ছিলেন। কিন্তু ধর্মান্ধ গোষ্ঠী চুপ ছিল না। তারা এতবড় পৈশাচিক হত্যাকাণ্ড ও বর্বরোচিত ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েও যেহেতু আইন-আদালতকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে পার পেয়ে গেছে এবং মিডিয়া, আইন শৃঙ্খলা বাহিনী, সুশীল সমাজ, অসাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর নীরবতা প্রত্যক্ষ করেছে কাজেই তাদের উৎসাহ-উদ্দীপনা ও সাহস বহুগুণে বেড়ে গেছে। তার প্রমাণ নোয়াখালীর সাম্প্রতিক ঘটনা। সেই নোয়াখালীতেই আজ বিভিন্ন সংখ্যালঘু সম্প্রদায় আক্রান্ত হচ্ছে। প্রাণহানি ঘটছে নির্দোষ মানুষের।

সুতরাং-

আসুন সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হই। আমাদের মানবতাবোধ হোক সার্বজনীন, আমাদের চেতনা হোক যাবতীয় ক্ষুদ্রতামুক্ত, আমাদের প্রতিবাদ হোক যাবতীয় অন্যায়ের বিরুদ্ধে, পক্ষপাতমুক্ত।