নির্বাচিত লেখা

দক্ষিণ এশিয়ায় ধর্মান্ধতার উত্থান: বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আমাদের করণীয়

জাতীয় প্রেসক্লাবের সন্নিকটে বাগিচা চাইনিজ রেস্টুরেন্টে হেযবুত তওহীদ ঢাকা মহানগর গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বদেরকে নিয়ে একটি গোলটেবিল বৈ......

স্বকৃত নোমানের ‘উজানবাঁশি’

প্রকাশিত: নভেম্বর ০৯, ২০২১

উজানগাঁ। চাঁদমারি জেলার গগনতলা উপজেলার অন্তর্গত সীমান্তবর্তী গ্রাম। সেখানে আছে এক অপ্রশস্ত নদী, যার নাম নীলাক্ষী। এপার থেকে ঢিল ছুঁড়লে ওপারে গিয়ে পড়ে। ওপারে দুইশ কুড়ি একরের নয়নচর, যার মালিকানা নিয়ে সেই পাকিস্তান আমল থেকে চলছে দুই দেশের সীমান্তরক্ষীদের মারামারি। কিছুদিন আগেও সেখানে কাঁটাতারের বেড়া ছিল না, ছিল শুধু বিডিআর-বিএসএফ জওয়ানদের টহলদারি ও চেকপোস্ট। সীমান্ত মানেই চোরাকারবারি, স্থানীয় পরিভাষায় ব্ল্যাক। গ্রামের মানুষের মূল পেশা এটাই। রাজকাটা প্রান্তর পার হয়ে, নো ম্যানস্ ল্যান্ডের ওপারে প্রতিবছর চৈত্রসংক্রান্তির মেলায় চড়কপূজা হয়। সীমানা পেরিয়ে বাংলাদেশের নাগরিকরাও যোগ দেয় মেলায়। সেটা ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য। 

এই পটভূমিতে ‘উজানবাঁশি’ উপন্যাসের ছবি এঁকেছেন কথাসাহিত্যিক স্বকৃত নোমান। সময় পরিবর্তন হয়, পরিবর্তন হয় মানুষের জীবনযাত্রা ও জীবনদর্শনের। বাংলাদেশ ও ভারতের এই সীমান্তে সেই পরিবর্তনের রূপ কেমন ছিল, আধুনিকতার আগমনে পূর্বপুরুষের সঙ্গে উত্তরপুরুষের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক মনোভাবের পার্থক্য ও বিরোধগুলো কী আঙ্গিকে প্রকাশিত হচ্ছিল, তা-ই উপন্যাসের উপজীব্য। সময়কাল মুক্তিযুদ্ধ থেকে নতুন শতাব্দীর প্রথম দশক পর্যন্ত। 


উজানবাঁশি

সীমানার এপারে ওপারে একই সংস্কৃতি, একই ভাষা, একই জীবনধারা। তবু কৃত্রিম সীমানা রেখা টেনে জোর করে মানুষকে আলাদা করা হয়েছে। ওপারে পূজার প্যান্ডেলে গান গাইতে আসেন মান্না দে, বাজে রাজা হিন্দুস্তানী ছায়াছবির গান। একই সুর বাজে এপারের মানুষের মুখে। এপারের শালিক ওপারে উড়ে যায়, তাদের জন্য কোনো সীমানা নেই। মানুষের জন্য কেন তবে এই জবরদস্তি? হিন্দু মুসলিম দুই দেশেই আছে এখনও। তাহলে ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগের উদ্যোগটাও তো ব্যর্থই বলা চলে। তাহলে? গ্রাম্য প্রবীণ হানু ব্যাপারি দেশভাগের কথা উঠলেই বলেন, ‘সবই বিটিশরার চালাকি। চালাকি কইরা তারা দেশটারে দুই টুকরা কইরা রাইখা গেছে। হালারা, দেশ কি তালের পিঠা?’

কায়েদ মওলানার দাদা এবাদত রেজার দাদার নাম ‘জগৎধর দাস’। তিনি মুসলিম হয়ে আরায়েত হোসেন নাম গ্রহণ করেন। তাহলে রক্তের ধর্ম কী? রক্ত না হিন্দু, না মুসলিম। শরিয়তপন্থী কায়েদ মওলানা করাচির মাদ্রাসায় পড়াশুনা করে মওলানা হয়েছেন। এক জীবন ধরে চলে তার ইসলামের গোড়াপন্থী ধারণা থেকে উদারপন্থী ধারণায় উত্তরণ, দৃষ্টিভঙ্গির ভাঙাগড়া। হিন্দু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে যিনি একসময় জুমার খোতবায় ঘৃণা ছড়াতেন, সেই তিনিই জীবনের শেষ প্রান্তে হিন্দুদের জন্য দোয়া করেন, রবীন্দ্রনাথের গান শুনে চোখের জলে ভাসেন, মিল খুঁজে পান রুমি হাফিজ খৈয়ামের ‘ইসলামিক’ শেরের সঙ্গে লালনের ‘বাউল’ গানের। দুলে ওঠে তার ‘বোধের ঘণ্টা’। যিনি প্রিয় সন্তান মোহনকে আলিয়া মাদ্রাসায় পড়াতে রাজি ছিলেন না, কারণ আলিয়া মাদ্রাসার ছাত্ররা কাটা পাঞ্জাবি আর প্যান্ট পরে। এগুলো পরা হারাম। পরতে হবে গোল ‘ওহাবি’ জোব্বা।

তার মতে আরবি, উর্দু ও ফারসি মুসলমানের ভাষা। এ তিন ভাষা ছাড়া অন্য কোনো ভাষায় লেখাপড়া করা হারাম। চেয়ার টেবিলে বসে কোর’আন পড়া হারাম। একইভাবে নারী শিক্ষাও হারাম। দুনিয়া তার চোখে এক ডাইনি বুড়ি যে পুত্র মোহনকে ফাঁদে ফেলার চেষ্টা করবে। কিন্তু রহস্যপুরুষ গল্পকথক মোখেরাজ খান মোহনের মনের মধ্যে বলেন, এই পৃথিবী কোনো ডাইনি বুড়ি নয়। এই পৃথিবী বেহেশতের বাগান, স্রষ্টার অপরূপ দান। মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে দুনিয়াকে আবাদ করার জন্য, বসে বসে এর ফলমূল খাওয়ার জন্য নয়। 

এভাবে বিকৃত ইসলামের ধ্যানধারণাগুলোকে ধর্মের উক্তি ও যুক্তি দিয়েই খণ্ডন করা হয় কাহিনীর ভাঁজে ভাঁজে। যার পরিণামে এক যুগ পরে সেই দরিদ্র কায়েদ মওলানাই পুত্র মোহনকে নিজে সঙ্গে নিয়ে মাস্টার্স-এ ভর্তি করান, বই কিনে দেন। পিতার সঙ্গে সন্তানের আদর্শের দ্বন্দ্বকে আশ্রয় করে প্রকাশিত হয়েছে প্রাচীনতা ও আধুনিকতার সংঘাত। সংঘাত মেটাতে কখনও উঠে আসে কোর’আনের আয়াত, নবীদের জীবনকাহিনী, কখনও আসে ইতিহাসের পাতা, আসে গীতা-মহাভারতের শ্লোক, লোকনাথ ব্রহ্মচারীর বাণী, কখনও আসে মোখেরাজ খানের বর্ণিত বিভিন্ন উপকথা। 

লাঠিয়াল সর্দার কালাগাজি যুদ্ধের সময় রাজাকারিতে লিপ্ত হয়। বিশ্বাসঘাতকতা করে ভূস্বামী অনাদি দত্তের সঙ্গে, যে অনাদি দত্ত মাদ্রাসা নির্মাণের জন্য দুই লক্ষ টাকা কায়েদ মওলানার হাতে তুলে দিয়েছিল। কিন্তু হিন্দু হওয়ায় শেষ পর্যন্ত তার টাকা কালাগাজির চাপে ফেরত দিতে বাধ্য হন কায়েদ মওলানা। কালাগাজি দেশ ছাড়তে বাধ্য করে এলাকার সম্ভ্রান্ত ও সাধারণ হিন্দু পরিবারগুলোকে। এই নোংরা গ্রাম্য রাজনীতি গণতান্ত্রিক রাজনীতিতেও ঠাঁই পায় যথারীতি। সেখানে চলে আইনকে পাশ কাটিয়ে এমপি আর দুর্নীতিগ্রস্ত মেয়র আর তাদের সন্ত্রসাীদের কুকর্ম। সেই কুকর্মের পরিধির মধ্যে ছাগল বলাৎকার, গণধর্ষণ, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে কুপিয়ে, পুড়িয়ে হত্যা পর্যন্ত কিছুই বাদ থাকে না। তাদের লেবাস কালাগাজির মতো নয়, তারা সভ্য, শিক্ষিত। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে দোর্দণ্ড প্রতাপশালী সাংসদ কুতুব বকশিকেও উজান গাঁয়ের সীমানা পেরিয়ে ভারত চলে যেতে হয়। ইতিহাস ফিরে আসে। 

ধর্ম নিয়ে যারা রাজনীতি করে তাদের প্রতিনিধি হিসাবে উপন্যাসে মোলাকাতে ইসলামী ও ছাত্র মুসাবা নামে সংগঠনকে হাজির করা হয়েছে। তাদের সাম্প্রদায়িক চিন্তাচেতনা ও রবীন্দ্রবিদ্বেষ, তাদের রগকাটা ও সন্ত্রাসীপনা আশি-নব্বই দশকের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে স্মরণ করিয়ে দেয়। 

খানিকটা আদর্শবাদী মোহন রেজাও সাংবাদিকতা করতে গিয়ে সত্য গোপন রাখার শর্তে প্রভাবশালী দুর্বৃত্তের টাকা গ্রহণ করে। উঠতি যৌবনের ডাকে সাড়াও দেয় বারবার। বুঝতে পারে প্রেম ও দৈহিক টানের ফারাক। শেষে মিথ্যা চাঁদাবাজির মামলায় ফেরারি জীবনের কষ্ট ভোগ করে ফিরে আসে রবীন্দ্রনাথের “বিপদে মোরে রক্ষা করো- এ নহে মোর প্রার্থনা” পড়ে। সাতদিন কারাবাস করলেও মিথ্যা মামলার দায় থেকে মুক্তিলাভ করে সম্মানের সাথে। জজ সাহেব আসামী সাংবাদিক মোহনকে প্রশ্ন করেন, এ পৃথিবীতে সবচেয়ে পবিত্র কী জিনিস? মোহন জবাব দেয় গীতা থেকে- “ন হি জ্ঞানেন সদৃশং পবিত্রমিহ বিদ্যতে, এই জগতে চিন্ময় জ্ঞানের মতো পবিত্র আর কিছুই নেই।” আদালতের এজলাসের মতো আত্মাহীন জায়গায় উচ্চকিত হয় সাহিত্য ও বিশুদ্ধ জ্ঞানের মহিমা। 

বহুদিন আগে একটি জমি খুড়তে গিয়ে কায়েদ মওলানা খুঁজে পেয়েছিলেন এক প্রাচীন শিলালিপি, যেখানে উৎকীর্ণ ছিল গীতার এই শ্লোক। এর অর্থ ও উৎস তালাশ করার জন্য বহু বই পড়তে হয় মোহনকে। এই জ্ঞান আহরণের যাত্রাপথে আসে অনেক বাঁক। তার চোখের সামনে থেকে সরে যেতে থাকে একেকটি আঁধার যবনিকা। গোটা উপন্যাসে লেখক যা কিছু দেখেন তার চরিত্রের চোখ দিয়েই দেখেন, নিজের দর্শন দিয়ে পাঠকের মগজ ভারী করার প্রয়াস করেন না। তিনি উপন্যাসের মূল চরিত্রকে দেবতায় পরিণত করেন না, পাপ-পুণ্যের অস্থিরতার মধ্যেই তাদের বসবাস, তারা পৃথিবীর জীব। তরুণ মোহন তারার আলোয় হেঁটে হেঁটে আবৃত্তি করেন জীবনানন্দের বোধ। “জানো না কি চাঁদ/ নীল কস্তুরি আভার চাঁদ/ জানো না কি নিশীথ/ আমি অনেক দিন/ অনেক অনেক দিন/ অন্ধকারের সারাৎসারে অনন্ত মৃত্যুর মতো মিশে থেকে/ হঠাৎ ভোরের আলোর মূর্খ উচ্ছ্বাসে নিজেকে পৃথিবীর জীব বলে/ বুঝতে পেরেছি আবার...।”

কায়েদ মওলানাও জানেন, আল্লাহর কালাম বিক্রি করে টাকা নেওয়া হারাম, তাই তিনি ‘হাদিয়া’ নেন। সেটাও তিনি হাতে নেন না, দপ্তরের দরজায় রেখে যায় সবাই। এই ক্ষেত্রে তিনি আর দশজন মোল্লা-মুন্সির মতই ধর্মজীবী। পাশাপাশি কৃষিকাজও করেন। তিনি খোতবাতে ব্ল্যাকারদের (চোরাকারবারি) নসিহত করেন এই পেশা থেকে ফেরার জন্য। তাদেরকে নামাজের প্রথম কাতারে দাঁড়াতে দেন না। কিন্তু ফল উল্টো। ব্ল্যাকাররা মসজিদে আসাই বন্ধ করে দেয়। তারা বলে, মওলানার পেশাই হচ্ছে এসব উপদেশ দেওয়া। এজন্য তাকে বেতন দেওয়া হয়, জমি দেওয়া হয়। ধর্মনেতাদের ওয়াজ-নসিহতের অসারতা ও প্রভাব সৃষ্টির অক্ষমতা এ ঘটনার মাধ্যমে ফুটে উঠেছে। চোরাকারবারি যে হারাম এমন কথা কেতাবে লেখা আছে কিনা জানতে চাইলে কায়েদ মওলানা নির্বাক হয়ে যান। কারণ এমন কথা তো কোনো কেতাবে লেখা নেই; ইসলাম তো সীমানাহীন পৃথিবীতে বিশ্বাসী। 

তবে উপন্যাসে ইসলামের শরিয়তপন্থী চিন্তাধারা থেকে ভারসাম্যহীন ও বিকৃত সুফিবাদকেই ‘মন্দের ভালো’ বানানো হয়েছে। একইভাবে কওমী মাদ্রাসার চেয়ে আলীয়া মাদ্রাসাকে উত্তম বলে প্রস্তাব করা হয়েছে। বলা হয়েছে, আলীয়া মাদ্রাসা ব্রিটিশদের একটি অবদান, যে মতের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করার সঙ্গত কারণ রয়েছে, বিস্তারিত আলোচনার সুযোগ রয়েছে। আলীয়ার পাঠ্যসূচির মধ্যে বিজ্ঞান-অঙ্ক ইত্যাদি ছিল ও আছে। কিন্তু সেখানে ‘ইসলাম’ হিসাবে যেটা শিক্ষা দেওয়া হয়েছে, সেটা ছিল ব্রিটিশ প্রাচ্যবিদদের তৈরি করা সিলেবাস মোতাবেক ব্যক্তিগত জীবনের নানাবিধ আমল ও মাসলা-মাসায়েলসর্বস্ব একটি বিকৃত ইসলাম। সেটা আল্লাহ ও রসুলের প্রকৃত ইসলাম ছিল না। সেটা ব্রিটিশ শাসনের প্রতি অনুগত ধর্মজীবী আলেম ওলামা তৈরির কারখানামাত্র। 

পক্ষান্তরে জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা থেকে মুসলমানদের পিছিয়ে রাখার জন্য এবং তাদেরকে জঙ্গিবাদের ঘুঁটি বানানোর জন্য যে আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রকারীরা কওমী বা খারেজি মাদ্রাসার পেছনে কাড়ি কাড়ি টাকা ঢালে, এমন সত্যও প্রকাশিত হয়েছে। জ্ঞান-বিজ্ঞানে মুসলমানদের পিছিয়ে থাকাকেই তাদের আজকের লাঞ্ছনা ও হীনতার কারণ মনে করা অবশ্য বড় একটা বিভ্রান্তি। কারণ ইতিহাস বলে, মুসলমানরা যখন বহিঃশত্রুর দ্বারা পরাজিত হয়েছিল, সে সময়টিতে তারাই ছিল সকল প্রকার জ্ঞান বিজ্ঞানের ধারক-বাহক-শিক্ষক। বস্তুত তাদের জাতিগত পরাজয়ের কারণ ছিল তাদের প্রাথমিক যুগের দুঃসাহসী সামরিক চরিত্র ও প্রেরণা হারিয়ে ফেলা; যার জন্য দায়ী দীনের অতি-বিশ্লেষণকারী আলেম ওলামাদের সৃষ্ট মাজহাব-ফেরকাগত ঐক্যহীনতা এবং বিকৃত অন্তর্মুখী সুফিবাদী দর্শনের প্রভাবে জাতির সংগ্রামবিমুখতা ও দুনিয়াবিমুখতা।  

পাঠক হিসাবে আমার ব্যক্তিগত রুচির সঙ্গে দ্বন্দ্ব বাঁধিয়েছে উজানবাঁশির একটিমাত্র বিষয়। সেটা হচ্ছে, আদিরস বা অশিষ্ট শব্দের অকারণ প্রয়োগ। একজন ঘুমন্ত ব্যক্তিকে সাপে কামড়েছে। সে সময় তার দেখা আদিরসাত্মক স্বপ্নটির বর্ণনা ছাড়াও কাহিনীটি পূর্ণতা পেতে পারত। একটি মেয়ে সকাল বেলা নদীতে এসে একটি বিশেষ ন্যাকড়া ধুচ্ছে। তাকে দিয়ে কলস ভরালে কী দোষ ছিল? পোশাকহীন বাঘামামার অঙ্গপ্রত্যঙ্গের উপমা সহযোগে পুনঃপুনঃ উল্লেখের আদৌ কোনো প্রয়োজন ছিল কি? এ বিষয়গুলো হয়ত উপন্যাসের গাম্ভীর্য খর্ব করেছে। 

উজানবাঁশিতে বিলুপ্তপ্রায় ছিন্নমূল সাপুড়েদের জীবনযন্ত্রণার করুণ চিত্র যে কোনো পাঠককে ব্যথিত করবে। প্রতিনিয়ত অপমান সয়ে যাওয়া, কোথাও বিচার না পাওয়া, একবেলা খেয়ে না খেয়ে জীবনধারণ করা তাদেরকে পেশাত্যাগে বাধ্য করে। সারাদিন সাপের ঝুড়ি আর বীন নিয়ে গ্রামে গ্রামে ঘুরেও দশটা টাকাও কামাতে পারেনি তরুনাথ। রাগে, দুঃখে, অভিমানে সে সাপগুলোকে জঙ্গলে ছেড়ে দেয়, কিন্তু সাপগুলো তাকে ত্যাগ করে না। ক্রম অগ্রসরমাণ যন্ত্রসভ্যতার আগ্রাসনে পূর্বের বহু পেশা হারিয়ে যাবে এটা স্বাভাবিক হলেও বেদনার।

উপন্যাসের কালখণ্ডে গ্রামীণ বাংলার জীবনযাত্রায় যন্ত্রসভ্যতার হুলুস্থুল বাঁধেনি। জলে-জঙ্গলে তখনও জ্বিনদের বসতি। তারা কেউ মণিধর সাপ সেজে থাকে, কেউ মানুষকে ভয় দেখায়, আবার কেউ মড়াখেকো। আলখেল্লা পরে অনাদি দত্তের ভুতকে মাঝরাতে রবীন্দ্রনাথের মতো হেঁটে বেড়াতে দেখেছে গ্রামের শিক্ষিত-অশিক্ষিত, হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে বহুমানুষ। আবু তোয়াব নামে একজন আসবেন, তিনি গ্রামবাসীকে সঠিক পথ দেখাবেন এমন জনশ্রুতি তাদের মধ্যে গেঁড়ে দিয়েছে এক অপেক্ষা। অনেকটা ইমাম মাহদির (আ.) জন্য অপেক্ষার মতো, যা জাতিকে নিশ্চেষ্ট করে। গ্রামে পোশাকহীন এক রহস্যময় ব্যক্তির আগমনের পর তাকেই অনেকে আবু তোয়াব বলে ধরে নেয়। তাকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে ওঠে তারা। তার মৃত্যুর পর চলে মাজার তাকিয়া, চলে উরস আর শিরনির সংস্কৃতি। আসে এক রহস্যময় বাঘ, যার পেটে বাঘামামা চল্লিশ বছর ছিল বলে গুজব রয়েছে। ধর্মীয় আবেগ উভয় পারের মানুষের মধ্যে এতটাই প্রবল হয়ে ওঠে যে, তারা রাষ্ট্রীয় সীমানাকে অস্বীকার করে, পদদলিত করে সীমান্তরক্ষীদের। 

যদি প্রশ্ন করা হয়, উজানবাঁশি পড়ে একজন পাঠক কী পাবে, আমি বলব এমন একটি সময়কে পাবে যে সময়টা আমরা সবেমাত্র পার হয়ে এসেছি, যার রেশ এখনও বর্তমান। অজ্ঞানতাকে পেছনে ফেলে জ্ঞানকে শক্তিতে রূপান্তরিত করার স্পৃহা সে পাবে। ধর্মের নামে ঘৃণা বিদ্বেষ নয়, মানবতাবোধকে জাগ্রত করার শিক্ষা সে লাভ করবে। ধর্মকে অন্ধবিশ্বাসের বস্তু হিসাবে গ্রহণ না করে এক্ষেত্রেও যুক্তিপ্রয়োগ ও প্রশ্ন করতে শিখবে। কেবল বিনোদন দেওয়ার জন্য যেসব উপন্যাস লেখা হয়, উজানবাঁশি সে কাতারে পড়ে না।