ধর্ম সংকীর্ণ নাকি প্রশস্ত

প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারী ২৭, ২০২১

ইহুদিদের শরীয়তে কোনো সমস্যা ছিল না। মুসা (আ) যে শরীয়ত (Law of Moses) দিয়েছিলেন সেটা ইহুদিরা অক্ষরে অক্ষরে অনুসরণ করত। কিন্তু সেটা করতে গিয়ে ধর্মের যে প্রাণ, অর্থাৎ মানবিকতা- সেটাকে তারা উপেক্ষা করে ধর্মকে একটা কাটখোট্টা বিষয়ে পরিণত করেছিল। মুসা (আ) এর পরের নবী ঈসা (আ) এলেন। কারণ, মুসা (আ) এর আনা ধর্মে (Law of Moses) বিকৃতি ঘটেছিল। বিকৃতিটা কোথায়? বিকৃতিটা আত্মায়, ধর্মের প্রাণে। ধর্মের প্রাণ কি? ধর্মের প্রাণ মানবতা। ধর্মের প্রাণ যে মানবতা সেটা কোথায় লেখা আছে? শরীয়তে আছে? না, নেই। একটা গাড়ির ম্যানুয়েল বুকে গাড়ির কোন সমস্যা হলে কি করতে হবে, কোথায় মবিল দিতে হবে, কোথায় কোথায় গ্রিজ দিতে হবে সেগুলো উল্লেখ থাকে। কিন্তু গাড়ি দিয়ে যে আপনি ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম, খুলনা কিংবা সিলেট-রংপুর যাবেন সেটা লেখা থাকে না। সেটা লেখা থাকে আপনার মস্তিস্কে, ধারণায়। একইভাবে ধর্মের শরীয়তে সেগুলো লেখা নাও থাকতে পারে। কিন্তু ধর্মীয় বিধানের লক্ষ্য যে মানবতা, শান্তিরক্ষা এগুলো প্রমাণ হয় কাজে, আচরণে। 

ঈসা আ অন্ধ ব্যক্তির আরোগ্য

যেহেতু মুসা (আ) এর শরীয়তে কোনো সমস্যা ছিল না সেহেতু ঈসা (আ) তাদের কি ভুল ধরবেন? তিনি শরীয়তের ভুল ধরলেন না। তিনি মুসার (আ) শরীয়তকে সত্যায়ন করলেন। কিন্তু তিনি সেগুলোর সঠিক প্রয়োগ, স্থান-কাল ও পাত্র দেখিয়ে দিতে শুরু করলেন। শরীয়তকে বাকিয়েঁ-চুড়িয়ে ধর্মের হর্তা-কর্তা রাব্বাই-সাদ্দুসাই-ফরিসীরা যে তাদের স্বার্থ উদ্ধার করছিল, তার প্রতিবাদ করলেন। 

ধর্ম যে কাটখোট্টা, অমানবিক বিষয় নয় সেটা প্রমাণে তিনি কোনো এক শনিবার সিনাগগের দুয়ারে বসে থাকা এক অন্ধের চোখ ভালো করে দিলেন। ইহুদি পণ্ডিতেরা হৈ হৈ রৈ রৈ করে উঠল। তারা জনগণকে শুনিয়ে বলতে লাগল, আমরা বলেছিলাম না যে এই লোক ধর্মদ্রোহী? দেখো, এই লোক বন্ধের দিনে (Sabbath day) দুনিয়াবী কাজ করে মুসার (আ) শরীয়ত লংঘন করেছে! 

ঈসা (আ) মুসার (আ) শরীয়তে স্বীকৃতি দিয়ে কেন এমন কাজ করতে গেলেন, তাও শনিবারে? মূলত তিনি এটাই তাদেরকে বোঝাতে চেয়েছেন যে মানবিক কাজ, পরোপকার- এগুলো কখনো শরীয়তবিরুদ্ধ কাজ নয়। ধর্মের প্রাণই হচ্ছে এসব। শরীয়তের নাম করে ভালো কাজ কখনো বন্ধ করা যায় না। এভাবে শরীয়তের অন্ধ অনুসরণ করতে থাকলে ধর্ম তার প্রাণ হারাবে। গোটা ইহুদি জাতির এ (আত্মিক) সংশোধনের জন্যই তিনি প্রেরিত হয়েছিলেন। 

এবার আসুন আমাদের শেষ রসুলের ইসলামের দিকে তাকাই। আমাদের আলেম সমাজ ও পূর্ববর্তী স্কলারদের গভীর গবেষণা ও কঠোর অধ্যবসায়ের ফলে যে মাসলামাসায়ের কিতাবের পাহাড় দাঁড়িয়েছে, সেগুলোর আলোকে গান-বাজনাকে পুরোপুরিভাবে হারাম করা হয়েছে। গান নাকি শয়তানের আওয়াজ। এ ধরনের কাঠিন্যতা আরোপ করে ইসলামকে প্রায় সব ধরনের সংগীত, শিল্পচর্চা, চিত্রকলা, ভাস্কর্য ইত্যাদি নান্দনিক কাজ থেকে সরিয়ে রেখেছে। এই যে কাঠিন্যতা, এই যে কাঠখোট্টা চরিত্র, এটাই কি রসুলাল্লাহর (স) আনা ইসলাম? না, মোটেও না। রসুলাল্লাহর আনা দীনের আমরা শুধু একটা নামই জানি। সেটা হচ্ছে ইসলাম। কিন্তু এ ধীনের আরো বেশ কিছু নাম আছে। দীনুল ওয়াসাতা (ভারসাম্যপূর্ণ দীন), দীনুল ফিতরাহ (প্রকৃতির ধর্ম) দীনুল কাইয়্যেমা (চিরন্তন, শাশ্বত, সনাতন দীন)। 

দ্বীন/ধর্ম কেবল কঠোর বিধিনিষেধের কাঠখোট্টা বিষয় নয়। কঠোরতার মাঝে এর মধ্যে ফল্গুধারার মতো বয়ে যায় দয়া-মায়া, ক্ষমা-ভালোবাসা। ধর্ম থেকে যখন প্রেম-করুণা, দয়া-মায়ার তিরোধান ঘটে তখন ধর্ম তার প্রাণ হারায়। ধর্ম যখন উদারতার পরিবর্তে সংকীর্ণতার ঘেরাটোপে বন্দী হয় তখন মানুষের কাছ থেকে ধর্মের আবেদন হারিয়ে যায়। 

রাসুলুল্লাহ (সা.) ক্রীড়ারত হাবশিদের উৎসাহ দিয়ে বলেছিলেন, ‘ছেলেরা, খেলে যাও! ইহুদিরা জানুক যে আমাদের দীনের প্রশস্ততা আছে। আমাকে প্রশস্ত দীনে হানিফসহ প্রেরণ করা হয়েছে।’ (বোখারি : ১/১৭৩, মুসলিম : ২/৬০৮)