হেযবুত তওহীদ নিয়ে কিছু অপপ্রচার ও তার জবাব

প্রকাশিত: মে ১৯, ২০২১
হেযবুত তওহীদ নিয়ে কিছু অপপ্রচার ও তার জবাব

হেযবুত তওহীদ একটি সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক, অহিংস ও ধর্মীয় সংস্কারমূলক আন্দোলন। আন্দোলনটির প্রতিষ্ঠাতা টাঙ্গাইলের সম্ভ্রান্ত জমিদার পন্নী পরিবারের সন্তান মোহাম্মদ বায়াজীদ খান পন্নী ১৯৯৫ সালের ১৬ ই ফেব্রুয়ারি টাঙ্গাইলের করটিয়ায় জমিদারবাড়ি দাউদমহল থেকে শুরু করেন। বর্তমানে হেযবুত তওহীদের সর্বোচ্চ নেতা (ইমাম) হলে হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম, যাঁর নেতৃত্বে আন্দোলনটি বাংলাদেশে বর্তমানে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছে। 

গতানুগতিক ইসলামী আন্দোলনগুলোর সাথে এই আন্দোলনটির ভাবাদর্শ ও আকীদার মধ্যে পার্থক্য থাকায় আন্দোলনটির শুরু থেকে এখন পর্যন্ত বিভিন্ন শ্রেণি, দল, মতের মানুষদের দ্বারা সমালোচিত হয়ে আসছে। আদর্শিক আন্দোলন নিয়ে সমালোচনা থাকবে এটাই স্বাভাবিক কিন্তু অপপ্রচার সভ্যসমাজে কিংবা ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে কোনোভাবেই কাম্য নয়। 

সোশ্যাল সাইটে প্রায়শ হেযবুত তওহীদ নিয়ে একটা স্বার্থান্বেষী শ্রেণি বিভিন্ন অপপ্রচার করে থাকেন। তাদের অপপ্রচারে বিভ্রান্ত হয়ে সাধারণ মানুষও হেযবুত তওহীদ নিয়ে ভুল ধারণা করেন। কারণ, এই অপপ্রচারকারী শ্রেণিটার অধিকাংশই ধর্মীয় লেবাসধারী এবং তাদেরকে সহজেই বিশ্বাস করেন। 

অথচ তারা ধর্মের লেবাস গায়ে দিয়ে কত বড় মিথ্যাচারিতা করছেন, তা অনেকেই কল্পনাও করতে পারবেন না। 

ইদানীং হেযবুত তওহীদ নিয়ে যে অপপ্রচারগুলো ফেসবুক ও বিভিন্ন ব্লগে দেখা যায়, সেগুলোর কয়েকটা এখানে উপস্থাপন করা হলো। এর বাইরে আপনাদের জানা থাকলে কমেন্ট বক্সে উল্লেখ করুন, এখানে সংযোজন করা হবে ইনশাআল্লাহ। 

অপবাদ বা প্রশ্ন করা সহজ কিন্তু তার জবাব হয় দীর্ঘ। এখানে চেষ্টা করবো পয়েন্ট আকারে মূল অপবাদগুলোর জবাব উপস্থাপন করতে। প্রায়শ একই প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয় আমাদের। তাই কিছু লেখা এখানে কপি-পেস্ট করা হবে। পাঠকের পড়ার ধৈর্য্য কাম্য। 

অপপ্রচার - ১: বায়াজীদ খান পন্নী ও রাজাকার প্রসঙ্গে

ইতিহাস জানতে হয়। সুলতানি আমলে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার সুলতান ছিলেন কররানি বংশের সুলতানরা। ১৫৭৬ সালে রাজমলের যুদ্ধে মোঘল শাসকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে বাংলার স্বাধীনতার জন্য জীবন দিয়েছিলেন কররানী (পন্নী) বংশের সুলতান দাউদ খান কররানী। ইতিহাসের পাতায় তা স্বর্ণাক্ষরে লিখিত আছে।

ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনেও এমামুযযামান সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন তেহরিক এ খাকসারের পূর্ব বাংলার বিপ্লবী কমান্ডার ছিলেন হেযবুত তওহীদের প্রতিষ্ঠাতা এমামুযযামান মোহাম্মদ বায়াজীদ খান পন্নী।

প্রথম কথা হচ্ছে, এমামুযযামানের কররানি পরিবারের ইতিহাস ৫০০ বছর পুরনো।এমামুযযামানের পরিবার ব্রিটিশ আমল থেকেই এই অঞ্চলের সবচাইতে প্রভাবশালী পরিবার। পাকিস্তান সরকার যখন গঠিত হয় তখন ওই সময়ে সরকারে সব সময় উনার পরিবারের সঙ্গে সম্পৃক্ত অনেকেই থাকতেন। উনার খালু বগুড়ার নওয়াবজাদা মোহাম্মদ আলী চৌধুরী পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় উনারা রাজাকারদের মত সৈন্যদের সহযোগিতা করেননি। কিন্তু এলাকায় যেন উনারা থাকেন এবং আশেপাশের লোকদের নিরাপত্তা দিতে পারেন সেজন্য সবাই মিলে ধরেছেন এলাকা ছেড়ে যেন না যান। যুদ্ধের সময় তিনি এবং তার বাবা দুজনই এজন্য এলাকায় ছিলেন। তারা বহু গ্রামবাসীর জীবন বাঁচিয়েছেন। শুধু তাই নয় কাদেরিয়া বাহিনী এমামুযযামানের পরিবারের বহু অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধ পর্যন্ত করেছে। এক গ্লাস পানি দিয়ে সহযোগিতা করার কারণে যদি মুক্তিযোদ্ধা হওয়া যায় তবে রীতিমতো অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে সহযোগিতা করার কারণে কি রাজাকার হয়? এমামুযযামানের বোন আমেনা পন্নী যুদ্ধের সময় আমেরিকায় ছিলেন। সেখান থেকে তিনি ত্রাণ সাহায্য সংগ্রহ করে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে পাঠিয়েছেন বিমান ভর্তি করে। তখন আপনাদের মতো মুফতিদের জন্মও হয়নি। এমামুযযামানের চাচাতো ভাই মোহাম্মদ খুররম খান পন্নী ফিলিপাইনের রাষ্ট্রদূত ছিলেন। তিনি সারা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যোগাযোগ করে বাংলাদেশের পক্ষে সমর্থন আদায় করেছেন। আমেনা পন্নী মুক্তিযুদ্ধ হওয়ার সময় কনসার্ট ফর বাংলাদেশের একজন আয়োজক ছিলেন। ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ কি সেটা হয়তো আপনারা জানেনই না? পাকিস্তান কনস্যুলেট ভবন এর ভিতরে ঢুকে সেখান থেকে পাকিস্তানের পতাকা নামিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়েছিলেন তিনি। স্বাধীনতার পক্ষে, স্বাধীনতার জন্য এটা কত বড় দুঃসাহসিকতার কাজ সেটা তো আপনারা ভাবতেও পারবেন না। যুদ্ধের শেষের দিকে সারাদেশে ব্যক্তিগত স্বার্থ উদ্ধারের জন্য কি ধরনের কর্মকাণ্ড হয়েছে তা যেকোনো সচেতন মুক্তিযুদ্ধাকে জিজ্ঞাসা করলেই জানতে পারবেন।

কিন্তু কাদের সিদ্দিকী যুদ্ধ শেষের দিকে এসে অন্যের কথায় প্রভাবিত হয়ে এমামুযযামান এবং তার বাবাকে ধরে নিয়ে যায় অন্যায় ভাবে। কিন্তু মারতে পারেনি। গুজবে কান দিয়ে কাদের সিদ্দিকী নিয়ে যাওয়ার পর বড় ভাই লতিফ সিদ্দিকী জানতে পেরে সসম্মানে বাড়িতে পৌঁছে দেন।

এখানে একটা কথা বলতেই হবে, পুরো দেশ যখন পাকিস্তানের আর্মি ডিপ্লয়েড করল তখন টাঙ্গাইল অঞ্চলের করোটিয়ার জমিদার বাড়িকে তারা দখল করে নিল। ফলে তাঁরা অনেকটা বন্দীই ছিলেন।

যুদ্ধের পর কাজী নজরুল ইসলাম এর চিকিৎসা করার জন্য বঙ্গবন্ধু নিজেই এমামুজ্জামান কে হোমিও চিকিৎসক হিসেবে বাছাই করলেন। তিনি কি জানতেন না এমামুজ্জামান রাজাকার নাকি বাংলাদেশের পক্ষে? আজ আপনারা এসে মার থেকে মাসির দরদ বেশি দেখানো শুরু করলেন।

[বি.দ্র. লেখাটি বাংলাদেশের জনৈক এক মুফতিকে উদ্দেশ্য করে লেখা হয়েছিলো। যিনি সর্বপ্রথম এই অপপ্রচার করেছেন।]

অপপ্রচার - ২: হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম ও জামাত-শিবির প্রসঙ্গে

সত্যের সন্ধানের জন্য মানুষ কত স্থানে যায়, কত দলে ভিড় করে। এটাই স্বাভাবিক। সেলিম সাহেব নিজেই তাঁর অনেক ব্ক্তব্যে বলেছেন সত্যের সন্ধানে তিনি বিভিন্ন দলের মানুষের কাছে গেছেন, কিন্তু শেষে তিনি হেযবুত তওহীদের প্রতিষ্ঠাতা বায়াজীদ খান পন্নীর কাছে এসে সত্যের প্রকৃত সন্ধান পান, প্রকৃত ইসলামের সন্ধান পান। 

উমার রা. এর জীবনীতেই দেখেন তিনি একসময় ইসলামের বিরোধিতা করেছেন, রাসূল সা. এর বিরোধিতা করেছেন। অথচ তিনিই পরে ইসলামের খলিফা হয়েছেন। 

ধরুন, একজন মানুষ আগে নাস্তিক ছিলেন কিংবা ইসলামের ঘোর বিরোধী। পরে তিনি আস্তিক ও মুসলিম হলেন। এখন আপনার বিবেক কী বলে? অতীতে তিনি নাস্তিক থাকার কারণে বর্তমানে তার আস্তিক/মুসলিম হওয়ার গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছে? অথবা উমার রা. ও অন্যান্য সাহাবীদের বেলায়? 

তো তাদের ক্ষেত্রে যদি এত বড় বৈপরীত্য মেনে নিতে পারেন, সেখানে সেলিম সাহেবকে মেনে নিতে সমস্যা কোথায়? নাকি তিনি মানুষকে এখন জামায়াতে ইসলাম কিংবা শিবিরের দিকে আহ্বান করছে? অথচ দেখতে পাচ্ছি - সোনাইমুড়িতে হেযবুত তওহীদের ২ সদস্যকে নৃশংস হত্যার জঘন্য ঘটনার জন্য তিনি জামায়াত ও চরমোনাইকে দোষারোপ করেছেন।  

অপপ্রচার - ৩: ইহুদি খ্রিস্টান সভ্যতা দাজ্জাল এবং ইহুদি-খৃষ্টানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা ফরজ প্রসঙ্গে

অনেকেই বলে থাকেন, হেযবুত তওহীদ যেহেতু ইহুদি-খৃষ্টানদের তৈরি সভ্যতাকে দাজ্জাল বলেছে এবং হাদিস মোতাবেক দাজ্জালকে ধ্বংস করা ফরজ -  সে অনুসারে ইহুদি-খৃষ্টানদের সাথে হেযবুত তওহীদ যুদ্ধ করতে চায়। 

এখানে আংশিক সত্য আছে। শেষের কথাগুলো হেযবুত তওহীদের নয়। 

হ্যা, হেযবুত তওহীদ বিশ্বাস করে ইহুদি-খৃষ্টানদের যান্ত্রিক সভ্যতাই রাসূল সা. বর্ণিত দাজ্জাল। তবে হেযবুত তওহীদ কোথাও বলেনি ইহুদি-খৃষ্টানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বা সশস্ত্র কেতাল করতে হবে। খেয়াল করুন, দাজ্জাল বলা হয়েছে তাদের তৈরি সভ্যতাকে কিন্তু প্রযুক্তি বা ব্যক্তি বা জাতিকে নয়। 

সভ্যতা হলো নীতি-নৈতিকতায়, মানদন্ডে। যে নীতি-নৈতিকতা, মানদন্ড তারা তৈরি করেছে তা দিয়ে তারা পুরো পৃথিবীটাকে শাসন করছে তাদের সুবিধামতো। জাতিসংঘ, যুদ্ধনীতি, রাষ্ট্রনীতি, শাসননীতি, অর্থনীতি সব তাদের সুবিধামতো চলছে। যখন যেখানে ব্যবহার করা যায়, সেভাবে করছে। সভ্যতাকে মোকাবেলা বা ধ্বংস করতে হয় আরেকটি সভ্যতা দিয়ে। 

এই দাজ্জাল শুধু মুসলিম জাতির জন্যই নয়, হিন্দু-বৌদ্ধ-ইহুদি-খৃষ্টান নির্বিশেষে সকল মানবজাতির জন্যই ধ্বংসাত্মক ও ক্ষতির কারণ।

দাজ্জাল নিয়ে কোরআন-হাদিস, ইতিহাস রেফারেন্স, যুক্তি-প্রমাণসহ হেযবুত তওহীদে আলাদা একটি বই আছে। 

অপপ্রচার - ৪: হেযবুত তওহীদ বলে নামাজ নাকি ইবাদত নয়, সামরিক কুচকাওয়াজ! 

বাক্যটি একপেশে করে লেখা হয়েছে। হেযবুত তওহীদ কোথাও বলেনি সালাহ ইবাদত নয় বরং সামরিক কুচকাওয়াজ। হেযবুত তওহীদ বলে আল্লাহর সন্তুষ্টির লক্ষ্যে মুমিনদের সকল কল্যাণকর কাজই ইবাদত। যেমন- একজন পুলিশ যদি তার দায়িত্ব ঠিকঠাক ভাবে পালন করে তবে ঐটাও ইবাদত হলো। এর বিনিময় আল্লাহর কাছে পাবে। 

সালাহ অবশ্যই ইবাদত। হেযবুত তওহীদ সালাহর ব্যাপারে এই পরিসরের বাইরে গিয়ে বলেছে রাসূল সা. তাঁর উম্মাহকে যে সালাহর প্রশিক্ষণ দিয়েছেন সেখানে শুধুই সওয়াবের লক্ষ্যে নয় বরং সালাহ আত্মিক ও শারীরিক উভয়ভাবে একটা সুসংগঠিত, ঐক্যবদ্ধ, শৃঙ্খল জাতি উপহার দেয়। জামায়াতে সালাহ আদায়ে যত নিয়ম আছে সবগুলো ঐক্য-শৃঙ্খলা-আনুগত্যের শিক্ষা দেয়। এর যে ঐক্য-শৃঙ্খলা-আনুগত্যের শিক্ষা আছে, সেই শিক্ষাটাই বর্তমানে সামরিক কুচকাওয়াজে দেয়া হয়। ইসলাম এতই ডাইনামিক যে একটা জাতি গঠনে যা লাগে মহান আল্লাহ সব দিয়েছেন। 

এটা নিয়ে বলতে গেলে আরো অনেক কথা বলতে হবে। আপনার যদি সত্যিই সালাহ নিয়ে হেযবুত তওহীদের বক্তব্য জানতে ইচ্ছা হয় তাহলে 'ইসলামের প্রকৃত সালাহ' বইটি পড়ুন। 

অপপ্রচার - ৫: হেযবুত তওহীদের আরবীয় বানান প্রসঙ্গে

হেযবুত তওহীদ বাংলায় প্রবিষ্ট আরবীয় বানানের একটা নির্দিষ্ট নীতি ব্যবহার করে থাকে। যেমন: ইমাম > এমাম, ইসলাম>এসলাম, মুসলিম>মোসলেম প্রভৃতি। 

হঠাৎ করেই এই শব্দগুলো অনেকের কাছে বিকৃত কিংবা নতুন মনে হয়। অথচ হেযবুত তওহীদ প্রতিষ্ঠার আগে থেকেই বাংলা সাহিত্যে এই বানানরীতি ব্যবহার হয়ে আসছে। এমনকি এখনো মানুষ অনেক আরবীয় শব্দে এই নীতি ব্যবহার করে। যেমন: হিফাজত> হেফাজত, ইরশাদ > এরশাদ, ইশা>এশা, কাফির>কাফের, ইন্তেজাম > এন্তেজাম প্রভৃতি। 

এই সবগুলোই আরবীয় শব্দ। হেযবুত তওহীদ এই ভাষানীতি ব্যবহার করলে সমস্যা কিন্তু অন্যরা করলে সমস্যা নেই। এর অর্থই হলো একচোখা নীতি। 

[বানানরীতি নিয়ে নিচের লেখাটি আর্টিকেল থেকে নেয়া হয়েছে]

যে কোনো সমৃদ্ধ ভাষাতে কমপক্ষে ৫টি স্বরধ্বনির উচ্চারণ থাকা অবশ্যক। সেগুলো হলো- আ-কার, এ-কার, ই-কার, ও-কার, উ-কার.

ইংরেজি, আরবি, বাংলা, হিন্দি, উর্দু, ফার্সি, ম্যান্দারিন (চাইনা), জার্মান, ফসাসি ইত্যাদি সব ভাষাতেই এ ধ্বনিগুলো রয়েছে।

আরবীতে যে বর্ণের নিচে যের থাকবে বাংলায় সেখানে এ-কার (,ে a), এবং খাড়া ‘যের’ বা ‘যেরের পরে ইয়া-সাকিন’ যুক্ত থাকবে সেখানে ‘ই’ বা ‘ঈ’-কার (ি / ী) ব্যবহার করতে হবে। পেশ থাকলে ও-কার ( ো, O) এবং উল্টা পেশ বা পেশের পরে ওয়া-সাকিন থাকলে ‘উ’ বা ‘ঊ’-কার (ু/ ‍ূ) ব্যবহার করতে হবে। আর যবর থাকলে ‘আ’-কার বসবে।- এই নিয়ম অনুযায়ী আরবিতেও মৌলিক ৫টি স্বরধ্বনি রয়েছে।

মাত্র ৩০/৪০ বছর আগেও সর্বত্র আরবি ‘যের’ এর উচ্চারণ এ-কার দিয়েই করা হতো। উপমহাদেশের প্রখ্যাত আলেম মাওলানা আকরাম খাঁ রচিত বিখ্যাত ‘মোস্তফা চরিত’ গ্রন্থটিতেও ইসলামের বানানে ‘এসলাম’-ই লেখা হয়েছে। তখনকার একটি বহুল প্রচারিত পত্রিকার নাম ছিল ‘মোসলেম ভারত’ যা সকলেই অবগত আছেন। বাংলা একাডেমী থেকে প্রকাশিত অভিধানে ‘ইসলাম’ এবং ‘এসলাম’ দুটো বানানই উল্লেখ করা হয়েছে। অনেক আরবি শব্দ আমরা এখনও এ-কার এবং ও-কার দিয়ে উচ্চারণ করি। যেমন: মোবারক, কাফের, মোশরেক, আলেম, জালেম, এবাদত, গায়েব, এশা, মাহে রমজান, হাফেজ ইত্যাদি।

লাদেন (ওসামা বিন লাদেন), বেন আলী (নিউনেশিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট), লেবানন- ইত্যাদি শব্দগুলো আমরা তৈরি করিনি। ওগুলো আরবি ভাষাভাষীদের দেশের শব্দ।

আপনি যে নিয়মের কথা বলছেন সেটা ইদানীংকালে এসে কোর’আনের উচ্চারণের জন্য (সমগ্র আরবি ভাষার উচ্চারণের জন্য নয়) একটা উচ্চারণ রীতি ঠিক করেছে। সেই রীতিটির প্রচলন ঘটানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু আমাদের যুক্তি হলো- আরবি ভাষা থেকে যদি দু-টো মৌলিক স্বরধনী বাদ দেওয়া যায় তাহলে ভাষাটি দরিদ্র হয়ে পড়ে। যেমন বাংলা ভাষা থেকে যদি ‘এ-কার’ এবং ‘ও-কার’ বাদ দেওয়া যায় তাহলে- বাংলা ভাষাটি কেমন দরিদ্র হবে চিন্তা করে দেখুন। ‘দেশ’কে লিখতে হবে দিশ, ‘ভালোবাসা’ শব্দটি হয়ে যাবে ‘ভালুবাসা’, ‘মায়ের ভালোবাসা’ কথাটাকে লিখতে হবে- ‘মায়ির ভালুবাসা’। আবার অনেক শব্দ অন্য শব্দের সাথে ডাল-খিচুড়ি পাকাবে।

এজন্য আমরা আগের রীতিটি বাঁচিয়ে রাখার জন্য আমাদের কিছু প্রকাশনাতে এই বানানরীতি ব্যবহার করেছি।

এখন কেউ যদি এটা না মানতে চায়, আমাদের কোনো আপত্তি নাই। তাই এটা নিয়ে অপপ্রচার চালানো মোটেই ভদ্রতাবোধ নয়।

অপপ্রচার - ৬:  আল্লাহ দ্বীন হিসেবে ইসলামকে মনোনীত করার কথা বলেছেন, কিন্তু হেযবুত তওহীদের দাবি তাদের দল আল্লাহর মনোনীত দল

ইসলামই আল্লাহর মনোনীত দীন বা জীবনব্যবস্থা, এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো কোন ইসলাম? আজকের এই ইসলাম নাকি রাসূল সা. যে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করে গেছেন সেই ইসলাম? সেই ইসলামের রূপ আর আজকের রূপ কি এক? হ্যা, বাইরে থেকে দেখতে মনে হবে একই। সে ইসলামেও নামাজ-রোজা-হজ্জ-যাকাত ছিলো এখনো আছে। কিন্তু সেই ইসলামে শান্তি ছিলো, ন্যায় ছিলো, মানবতা ছিলো, নিরাপত্তা ছিলো, ঐক্য ছিলো, ভ্রাতৃত্ব ছিলো আর ইসলামে?

ইসলামের দুটো রূপ দাঁড়িয়ে গেছে। এক প্রকৃত ইসলাম আরেকটা বিকৃত ইসলাম। যে ইসলামের নামে সারাবিশ্বে সন্ত্রাসবাদ চলছে, অপরাজনীতি চলছে, ধর্মব্যবসা চলছে সেটা কখনোই প্রকৃত ইসলাম হতে পারে না। প্রকৃতের বিপরীতই বিকৃত। 

আল্লাহর রাসূল সা. কি এমনিই বলেছেন?

এমন সময় আসবে যখন- ইসলাম শুধু নাম থাকবে, কোর'আন শুধু অক্ষর থাকবে, মসজিদসমূহ হবে জাঁকজমক পূর্ণ ও লোকে লোকারণ্য কিন্তু সেখানে হেদায়াহ থাকবে না, আলেমরা হবে আসমানের নিচে সবচেয়ে নিকৃষ্ট জীব। তাদের তৈরী ফেতনা তাদের ওপর পতিত হবে। (বায়হাকী ও মেশকাত)

হেযবুত তওহীদ সেই প্রকৃত ইসলামের কথাগুলো তুলে ধরছে সবার সামনে। আপনাদের চোখ-কান, বিবেক আছে। তুলনা করুন, বুঝুন, সিদ্ধান্ত নিন। কারা আল্লাহর মনোনীত আর কারা নয়, সেটা অনুধাবনের বিষয়, অন্ধবিশ্বাসের নয়। কারণ, এটাই তো যৌক্তিক যারা ইসলামের হাজারো রূপের, দলের, মতের বিপরীতে প্রকৃত ইসলামের দিকে আহ্বান করবে তারাই আল্লাহর মনোনীত হবে। 

অপপ্রচার - ৭: হেযবুত তওহীদ বলে, ইসলাম আবির্ভাবের ৭০ বছরে বিকৃত হয়ে গেছে

না, ইসলাম আবির্ভাবে ৭০ বছরে বিকৃত হয়নি, ৭০ বছর পর ধীরে ধীরে ইসলাম রাসূল সা. এর মাধ্যমে যে রূপরেখায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো, সেই রূপরেখা থেকে বিকৃত হয়ে গেছে। একদিনে বা স্বল্পসময়ে হয়নি। ধীরে ধীরে হয়েছে। 

রাসূল সা. নিজেই বলেছেন, আমার উম্মাহর আয়ু হবে ৬০/৭০ বছর। এর জন্য এই আর্টিকেলটিই যথেষ্ট হবে বলে মনে করি - 

অপপ্রচার - ৮: হেযবুত তওহীদ জঙ্গি সংগঠন

এটি হলো সবচেয়ে হাস্যকর একটি অপপ্রচার। আর মজার বিষয় হলো এই অপপ্রচারটি বেশি করে থাকে কথিত তৌহিদি জনতা যারা কিছু দিন পরপর বিভিন্ন ধর্মভিত্তিক ইস্যু নিয়ে সহিংস আন্দোলন করে, জিহাদী জযবায় নিজেদেরকে শহিদি মিছিলে শামিল করতে সামাজিক যোগাযোগ সাইটে ঘোষণা দিয়ে থাকে। আদর্শিকভাবে যখন তারা হেযবুত তওহীদের সদস্যদের দ্বারা পরাজিত হয়  তখন তারা হেযবুত তওহীদকে নাস্তিক, খৃষ্টান, কাফির, ভারতের দালাল, ইহুদি-খৃষ্টানদের দালাল ইত্যাদি গালাগালি শেষে তারা বলে এটা জঙ্গি সংগঠন! তখন তারা প্রশাসন ও সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে! 

হেযবুত তওহীদের প্রতিষ্ঠাকাল থেকে ২৬ বছর কেটে গেলো, এখন পর্যন্ত দেশের প্রশাসন, গোয়েন্দাবাহিনী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কেউই জঙ্গিসংশ্লিষ্টতার প্রমাণ খুঁজে পায় নি। একাধিকবার দেশের বিচারিক ব্যবস্থায় হেযবুত তওহীদ নির্দোষ, বৈধ প্রমাণিত হয়েছে। হেযবুত তওহীদই একমাত্র এদেশে ধর্মীয় আন্দোলন যেটি দেশের আইনকে সবচেয়ে বেশি মেনে চলে এবং সম্মান করে। 

জঙ্গিসংশ্লিষ্টতা বুঝার জন্য কমনসেন্সই যথেষ্ট। এই পর্যন্ত হেযবুত তওহীদ বিক্ষোভ করেনি, সহিংস আন্দোলন করেনি, কোথাও অবৈধ অস্ত্র ব্যবহার করেনি। 

হেযবুত তওহীদ সবসময় খোলা চ্যালেঞ্জ দিয়েছে -  যেকোন ছদ্মবেশে বা যেভাবে পারেন, আমাদের সাথে মিশে দেখুন। এই চ্যালেঞ্জ কোনো জঙ্গি সংগঠন দিতে পারবে না। 

এই যে যারা হেযবুত তওহীদকে জঙ্গি ট্যাগ লাগানোর চেষ্টা করে, তারা কিন্তু সত্যিকারের জঙ্গি দলগুলো নিয়ে দুই লাইনও লেখা বা বলার সাহস রাখে না। অথচ হেযবুত তওহীদের বেলায় ফেসবুকে যত্রতত্র বলে যাচ্ছে।  তারাও জানে, হেযবুত তওহীদ যদি সত্যিকারের জঙ্গি দল হতো, আমরা এতকিছু বলার সাহসই পেতাম না। আন্দোলনটির বিশেষ করে নারী সদস্যদের নিয়ে এই অপপ্রচারকারী শ্রেণিটা এত জঘন্য কথা বলে থাকে, কোনো সুস্থ মানুষ তা সহ্য করতে পারবে না। 

আর জঙ্গিদল কখনো ধর্মব্যবসায়ীদের খেপিয়ে তুলে না বরং তাদের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করে জঙ্গি রিক্রুট করে। নিঃসন্দেহে এ যাবৎকাল ধর্মীয় আন্দোলনগুলোর মধ্যে হেযবুত তওহীদই সবচেয়ে বেশি ধর্মব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে সোচ্চার ভূমিকা রেখেছে। এবং এর খেসারত সদস্যদের জীবন দিয়ে পরিশোধ করতে হচ্ছে।

অপপ্রচার - ৯: হেযবুত তওহীদ কালেমা-সালাহ-যাকাহ-সওম-হজ্জ্ব কে ফরজ মনে করে না

হেযবুত তওহীদ কালেমা-সালাহ-যাকাহ-সওম-হজ্জ্ব এই পাঁচটিকে শুধু ফরজই মনে করে না। আন্দোলনটি বলে রাসূল সা. দীন প্রতিষ্ঠার যে পাঁচদফা কর্মসূচি দিয়েছেন তা বাস্তবায়নের জন্য যে চরিত্র প্রয়োজন সেগুলো এই পাঁচটি ফরজ ইবাদত ছাড়া হবেই না। 

হযরত হারেসুল আশয়ারী (রা:) হতে বর্ণিত। নবী (সা:) এরশাদ করেছেন, আমি তোমাদেরকে পাঁচটি বিষয়ে নির্দেশ দিচ্ছি (অপর বর্ণনায়- আল্লাহ আমাকে এ পাঁচটি বিষয় আদেশ দিয়েছেন)

সেগুলো হলো:

(১) ঐক্যবদ্ধ হও।

(২) (নেতার আদেশ) শোন। [ শৃঙ্খলা]

(৩) (নেতার ঐ আদেশ) পালন কর। [আনুগত্য]

(৪) হেজরত কর (যাবতীয় শেরক ও কুফরের সম্পৃক্ততা পরিহার করা)।

(৫) (এই দীনুল হককে পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠার জন্য) আল্লাহর রাস্তায় জেহাদ কর।

যে ব্যক্তি (কর্মসূচির) এই ঐক্যবন্ধনী থেকে এক বিঘত পরিমাণও বহির্গত হল, সে নিশ্চয় তার গলা থেকে ইসলামের রজ্জু (বন্ধন) খুলে ফেলল- যদি না সে আবার ফিরে আসে (তওবা করে) এবং যে ব্যক্তি অজ্ঞানতার যুগের (কোনও কিছুর) দিকে আহ্বান করল, সে নিজেকে মুসলিম বলে বিশ্বাস করলেও, নামাজ পড়লেও এবং রোজা রাখলেও নিশ্চয়ই সে জাহান্নামের জ্বালানী পাথর হবে 

[আল হারিস আল আশয়ারী (রা.) থেকে আহমদ, তিরমিযি, বাবউল এমারাত, মেশকাত]।

প্রশ্ন ১০: আপনারা বই-পত্রিকা বিক্রি করে টাকা নেন এটাও তো ধর্মব্যবসা?

বই-পত্রিকা প্রকাশনা একটা চলমান প্রক্রিয়া। এখানে আমরা নিজেদের টাকা দিয়ে প্রকাশনা করি। একদিনের বই-পত্রিকার টাকা পরের দিনে প্রকাশনায় ব্যবহৃত হয়। প্রকাশনার চলমান প্রক্রিয়ার জন্য বই-পত্রিকার কেবলমাত্র প্রকাশনার খরচ নেয়া হয়। তাই লক্ষ্য করে দেখবেন, আমাদের প্রকাশনাগুলো দাম বাজারের বাণিজ্যিক প্রকাশনার চাইতে অনেক কম দামে রাখা হয়।

বই-পত্রিকা প্রকাশ করেই কাজ শেষ নেই। সেটা পৌঁছানোর জন্য আমরা নিজেরাই মানুষের হাতে পৌঁছানোর উদ্যোগ নিয়েছি। কারণ, আমরা একটা আদর্শ প্রচারের কাজে নেমেছি। তাই কাজটা আমাদের নিজেদেরই করতে হবে এবং করছি। বলতে গেলে আমরা নিজেরাই হকারের ভূমিকা পালন করছি,যদিও পেশাগত জীবনে আমাদের কেউ চাকুরীজীবি, কেউ শিক্ষক, কেউ ছাত্র, কেউ বা গৃহিনী।

এই প্রচারের পেছনে আমরা নিজেরা যে পরিশ্রম ও সময় ব্যয় করছি, তার বিনিময় আমরা কারো কাছে নিচ্ছি না। যদি নিতাম তবে সেটা হতো 'ধর্মের বিনিময় নেয়া' বা ধর্মব্যবসা, যা আল্লাহ কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন।

রাসূল সা. এর সময় দীনের কাজ করে কেউ পার্থিব অর্থ-সম্পদ গ্রহণ করতো না কিন্তু বাহন হিসেবে উট আর সংগ্রামের জন্য ঘোড়া, যুদ্ধাস্ত্র ও বর্ম এগুলোর বিনিময় অন্যান্য বিক্রয়যোগ্য পণ্য-সামগ্রীর মতই ছিলো।

বই-পত্রিকা এগুলো এ যুগের জন্য দীন প্রতিষ্ঠার মাধ্যম বা বাহন। আর বই-পত্রিকা ও অন্যান্য মাধ্যমে সত্যের বালাগ পৌঁছে দেয়াই হলো দীন প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। এই সংগ্রাম, এই পরিশ্রমের বিনিময় হারাম।

এজন্যই আমরা কখনোই বলিনি, মাদ্রাসা তৈরি করা ধর্মব্যবসা, কোরআনের প্রকাশনা করা ধর্মব্যবসা, হাদিসগ্রন্থ প্রকাশনা করা ধর্মব্যবসা, ওয়াজ-মাহফিল আয়োজন করা ধর্মব্যবসা। আমরা সবসময় বলে এসেছি ধর্মীয় কাজের পারিশ্রমিক বা বিনিময় নেয়া হারাম। যেমন - নামাজ পড়িয়ে, জানাযা পড়িয়ে, কোরআনের খতম দিয়ে, ওয়াজ করে বিনিময় বা পারিশ্রমিক নেয়া হারাম।

হেযবুত তওহীদের বড় দুর্বলতা হলো - হেযবুত তওহীদ এমন এক সত্য নিয়ে সামনে এগুচ্ছে, যার বিপরীতে প্রচলিত ইসলামী দলমত, সেক্যুলার ও পাশ্চাত্যের আদর্শে উজ্জীবিত মিডিয়া সবাই একাট্টা। খুব খরস্রোতের বিপরীতে একা এগিয়ে চলা একটা আন্দোলনের নাম হেযবুত তওহীদ। 

হেযবুত তওহীদকে নিয়ে অপবাদমূলক লেখা লিখা খুবই সহজ কিন্তু বুঝা ততোটা সহজ নয়। কারণ ঐ যে, খুব খরস্রোতের বিপরীতে একা এগিয়ে চলা একটা আন্দোলনের নাম হেযবুত তওহীদ।