ইসলামে কি রাজনীতি আছে?

প্রকাশিত: মে ২৫, ২০২১
ইসলামে কি রাজনীতি আছে

 ১. 

ইসলামে কি রাজনীতি আছে? অনেক পুরান প্রশ্ন, কিন্তু স্পষ্ট জবাব জানেন এমন মানুষ কমই আছেন।  

যারা সেকুলারিজমে বিশ্বাসী, তাদের দাবি হলো ইসলামে রাজনীতি নাই। যুক্তি কী? যুক্তিটা হলো, ইসলামে রাজনীতি থাকলে কুরআনে রাজনীতি শব্দটা থাকত। পবিত্র কুরআনের কোথাও রাজনীতি শব্দটা নাই। 

এই যুক্তি দেখিয়ে তারা কিন্তু বেশিদূর আগাইতে পারে না, কারণ ধর্মভিত্তিক দলগুলো ইতিহাস থেকে প্রমাণ করে দেয় বিশ্বনবী একজন শাসক ছিলেন, সাহাবীরা শাসক ছিলেন এবং কুরআনের অনেক আদেশ নিষেধ আছে যেগুলো বাস্তবায়নের জন্য রাষ্ট্রশক্তি প্রয়োজন হয়। তার মানে ইসলামে রাজনীতি আছে।

এই দুইটা মতের ঠেলাঠেলি বাল্যকাল থেকে দেখে আসছি। কিন্তু আল্লাহর রহম এই বিভ্রান্তি থেকে মুক্ত হই ২০১০ সালে, যখন আমি হেযবুত তওহীদ আন্দোলনে যোগ দিই। আমার কাছে অনেকাংশেই পরিষ্কার হয়ে যায় ইসলামের রাষ্ট্র, রাজনীতি ইত্যাদি সংক্রান্ত ধারণা। ধর্মভিত্তিক দলগুলোর গোঁজামিলটা আমার নজরে পড়ে। আমি বুঝতে পারি কোথায় তারা ফাঁকিটা দিচ্ছে। আরও বুঝতে পারি সেকুলাররা কোথায় ফাঁকি দিচ্ছে। 

২.

রাজনীতি শব্দটি শোনামাত্র আমাদের চোখের সামনে যে ক্ষমতা নিয়ে টানাটানির চিত্র ভেসে ওঠে- এই সিস্টেম কি নবীজীর যুগে ছিল? ছিল না। ওই সময়ে ক্ষমতা পাওয়ার উপায় ছিল মোটামুটি দুইটা- যুদ্ধসূত্রে ও উত্তরাধিকার সূত্রে। রাজার ছেলে রাজা হত, কোনো ভোটের কারবার ছিল না। এছাড়া যুদ্ধে যারা বিজয়ী হত তারাও বৈধ শাসক বলে বিবেচিত হত। সেখানেও কোনো ভোটাভুটি বা নির্ধারিত মেয়াদকাল পর্যন্ত সরকার গঠন ইত্যাদি নিয়ম-কানুন ছিল না। 

এদিকে বর্তমান যুগে যে সেকুলারিজম প্রচলিত আছে, সেটাও কিন্তু বিশ্বনবীর যুগে ছিল না। ধর্ম বাদ দিয়েই রাষ্ট্র ও সমাজ চলতে পারে তা মানুষ কল্পনাও করতে পারত না । রাষ্ট্র থেকে ধর্মকে আলাদা করা হয়েছে বেশিদিন হয়নি, আজ থেকে মাত্র ৫০০ বছর আগে। কাজেই ১৪০০ বছর আগের কোনো ব্যবস্থার মধ্যে সেকুলারিজম খুঁজে বেড়ানোর মানেই হয় না। যারা জটিল জটিল তত্ত্বীয় ব্যাখ্যার গোঁজামিল দিয়ে সেকুলারিজমকে ইসলামিক প্রমাণের চেষ্টা করেন তাদের হিসাব কোনোদিনই মিলে না। জোর করে মিলাতে গেলে কিছু একটা হয়ত দাঁড়ায়- তবে সেইটা সেকুলারিজমও নয়  ইসলামও নয়। মাঝামাঝি হাস্যকর কিছু একটা হয়ে যায়।

তাহলে ইসলামের কাঠামোটা কেমন ছিল?

প্রকৃতপক্ষে বিশ্বনবী যে শাসনকাঠামো গড়ে তুলেছিলেন, সেটা ছিল ইউনিক একটা ব্যবস্থা। সম্পূর্ণ আলাদা। ওই যুগের অন্যান্য ব্যবস্থার সাথেও মিলে না, বর্তমান যুগের ব্যবস্থার সাথেও মিলে না। এমনকি তার ক্ষমতা গ্রহণের প্রক্রিয়া পর্যন্ত অস্বাভাবিক ছিল। বিশ্বনবী ক্ষমতা পেয়েছিলেন যে প্রক্রিয়ায় তা যুদ্ধও নয়, আবার রাজতান্ত্রিক উপায়েও নয়। মদীনার আওস ও খাজরাজ নামের দুইটি গোত্রের সাধারণ মানুষ তাকে নেতা হিসেবে মেনে নিয়েছিল এবং তাকে অনুরোধ করেছিল তাদের নেতৃত্বভার গ্রহণের জন্য। তাদের অনুরোধ মেনে নিয়ে বিশ্বনবী নিজের জন্মভূমি ছেড়ে মদিনায় গিয়েছিলেন। তাদেরকে সঙ্গে নিয়ে একটি সমাজব্যবস্থা গড়ে তুলেছিলেন, যা সময়ের প্রয়োজনে একদা বৃহত্তর রাষ্ট্রকাঠামোর জন্ম দিয়েছিল। সেই নতুন ধরনের রাষ্ট্রকাঠামোর অধিকাংশই ছিল কিন্তু পরিস্থিতি ও প্রেক্ষাপটের সাথে সম্পর্কিত।

সময় থেমে থাকে না। যুগ পাল্টাবে। নতুন যুগ আসবে। সেই নতুন যুগের সাথে তাল মিলিয়ে রাষ্ট্রীয় সিস্টেম আধুনিক হবে, সময়ের প্রয়োজনে সেই রাষ্ট্রকাঠামোতে ভিন্ন ভিন্ন সেকশন যুক্ত হবে এটাই স্বাভাবিক ছিল। সেজন্য ইতিহাসে পাই, নবীজীর ইন্তেকালের পরও খলিফাগণ রাষ্ট্রের বিভিন্ন কাঠামোয় পরিবর্তন এনেছেন, সংস্কার, সংযোজন ও বিয়োজন করেছেন। সময়ের চাহিদাকে তারা কেউ অস্বীকার করেননি, কোনোকিছুর অন্ধ অনুসরণ করেননি। সেই ধারা যদি আজও চলত তাহলে নিশ্চয়ই বর্তমান যুগে ইসলামের রাষ্ট্রকাঠামো হত সবচেয়ে যুগপোযোগী ও আধুনিক। গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, সেকুলারিজম ইত্যাদি মতবাদ হয়ত ইসলামের ওই রাষ্ট্রকাঠামোর কাছে পাত্তাই পেত না।

এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, ইসলামিক রাষ্ট্রব্যবস্থার যদি কোনো ধরাবাঁধা চেহারা না থাকে, সবই যদি স্থান-কাল-পাত্রের সাথে সম্পর্কিত হয়, তাহলে বর্তমান যুগের ব্যবস্থাগুলোর সাথে ইসলামের কি কোনোই সাংঘর্ষিকতা নেই? হ্যা, সাংঘর্ষিকতা আছে এবং সেই সাংঘর্ষিকতা শাখায়-প্রশাখায় নয়, একেবারে গোড়াতেই আছে। কীভাবে- তা ব্যাখ্যা করছি। 

৩.

ইসলামের রাষ্ট্রকাঠামো যদি একটি বাড়ি হয়, তাহলে সেই বাড়ির ভিত্তি হলো আল্লাহর চূড়ান্ত সার্বভৌমত্ব ও কর্তৃত্ব স্বীকার করে নেওয়া। আল্লাহর আদেশ নিষেধকে ভিত্তি বা ফাউন্ডেশন হিসেবে রেখে আপনি আধুনিক ডিজাইনের বাড়ি বানান, যত ইচ্ছা ঘরের খুঁটি বসান, যেমন  ইচ্ছা দরজা জানালা লাগান, যত ইচ্ছা ডেকোরেশন করুন, যেখানে ইচ্ছা ফুলগাছ বসান, তাতে কোনো আপত্তি নেই। 

ইসলাম আলটিমেটলি ন্যায়, সুবিচার, নিরাপত্তা ও শান্তি চায়। সুতরাং ভালোর জন্য, কল্যাণের জন্য, ন্যায়ের জন্য সকল বৈধ উপায়ে প্রচেষ্টা করুন। যে বিষয়ে আল্লাহর কোনো বক্তব্য নেই, সেই বিষয়ে আপনি নিজেই বিচারবুদ্ধি খাটিয়ে সিদ্ধান্ত নিন- তাতেও কোনো বাধা নেই। শুধু একটা জায়গাতে ইসলাম আপসহীন এবং ওই জায়গায় চুল পরিমাণও ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই। সেই জায়গাটি হলো- আল্লাহর অবিসংবাদিত কর্তৃত্ব, সার্বভৌমত্ব, বা অথরিটির জায়গাটি। ওখানটায় আল্লাহ কোনো অংশীদারিত্ব বরদাশত করেন না। করলে সেটাই হবে ইসলামের পরিভাষায় শিরক যার কোনো ক্ষমা নেই। 

দুঃখের বিষয় হলো- বর্তমানে সেই ভিত্তির উপর সেকুলাররাও নেই, ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোও নেই। তারা উভয়েই নিজেদের যার যার তালগাছকে ইসলামিক প্রমাণের চেষ্টায় লিপ্ত, অথচ গোড়ার কথাটা তারা দুপক্ষই চেপে যান। তারা বলেন না- তাদের রাজনীতির ধরন ইসলামিক বা সমাজতান্ত্রিক বা সেকুলার যাই হোক, সবগুলোই দাঁড়িয়ে আছে আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্য কারো অথরিটিকে স্বীকার করে নিয়ে। অর্থাৎ ইসলামের মূল দাবিটাতেই তারা নেই। অথরিটির দাবিই ছেড়ে দিয়েছে, তারপর কেউ মদিনা সনদের সাথে সেকুলারিজমের মিল খুঁজে বেড়াচ্ছে আর কেউ খলিফা নির্বাচনের সাথে বর্তমানের নির্বাচনব্যবস্থার মিল খুঁজে বেড়াচ্ছে। অথচ তাদের খোঁজাখুঁজিটা চলছে ইসলাম থেকে যোজন যোজন মাইল দূরে গিয়ে।

৪.

সুপ্রিয় পাঠক, এই লেখাটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। অনেক বড় একটি সাবজেক্ট অল্প কথায় তুলে আনার চেষ্টা করেছি। জানি না কতটুকু সহজ ভাষায় লিখতে পেরেছি বা বোঝাতে পেরেছি। যদি কারো বুঝতে অসুবিধা হয় তাহলে সেটা আমার ব্যর্থতা। ঠিক কোন জায়গাটাতে আমি বোঝাতে পারিনি তা আমাকে জানালে পরবর্তীতে আমি সেটা নিয়ে লিখতে পারব। আশা করি সহযোগিতা করবেন। 

আরেকটি বিষয় পরিষ্কার করে বলি- আমার এই লেখাটি নাস্তিক বা যারা ইসলামে বিশ্বাসী নন তাদের জন্য নয়। তাদের ব্যাপারটা আলাদা। তারা এই লেখার সাথে একমত নাও হতে পারেন। তারা বলতে পারেন আল্লাহর অথরিটি আমরা মানব কেন? যৌক্তিক প্রশ্ন। আল্লাহকে যদি তারা একমাত্র ইলাহ (সর্বোচ্চ অথরিটি) হিসেবে মানতেনই তাহলে তো তারা অমুসলিম থাকতেন না। কাজেই তাদের কাছে আমি সেই দাবি করছিও না। আমার কথাগুলো শুধু মুসলিমদের জন্য, যারা প্রতিদিন লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ জিকির করেন তাদের জন্য। তারা মুখে বলেন আল্লাহ হলেন সেই সত্ত্বা যার উপর আর কেউ নেই, যার আদেশ নিষেধের উপর আর কারো আদেশ নিষেধ নেই, যার নির্ধারণ করে দেওয়া মানদণ্ডের উপর আর কোনো মানদণ্ড নেই, কিন্তু বাস্তবে তারা এমন ব্যবস্থাকে ইসলামিক ব্যবস্থা হিসেবে প্রমাণের চেষ্টা করেন যেটা আল্লাহর অথরিটিকে স্বীকার করে না। যেটা মানুষকেই মানুষের উপর সর্বোচ্চ আদেশদাতা বানিয়ে দেয়, মানুষকেই মানুষের গোলাম বানিয়ে দেয়। আশা করি এই লেখাটি তাদের ভুল ভাঙাতে কিছুটা হলেও সহায়তা করবে।