আমাদের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ (পর্ব - ১)

প্রকাশিত: জানুয়ারী ২৫, ২০২১

আমরা যারা নিজেদেরকে মো’মেন, মুসলিম ও উম্মতে মোহাম্মমদী বলে দাবি করি, বিশ্বাস করি, নামায-রোজা-হজ্ব-যাকাতসহ হাজারো রকমের নফল এবাদত করি, পরকালে জান্নাতে যাওয়ার জন্য আশা রাখি, আমাদেরকে অবশ্যই জানতে হবে আমাদের ইতিহাস কী, আমরা কোথায় ছিলাম, কেমন ছিলাম আর বর্তমানে আমরা কী অবস্থার মধ্যে আছি এবং ভবিষ্যতে আমাদের করণীয় কী? 

আমাদের অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যৎ
সিরিয়ার একটি স্থাপনা

উম্মতে মোহাম্মদীর ইতিহাস, মুসলমানদের গৌরবময় ইতিহাস বর্ণনা করে শেষ করা যাবে না। এখানে খুব সংক্ষেপে এই ইতিহাসের মূল কাঠামোটা তুলে ধরার চেষ্টা করব। আজ থেকে ১৪০০ বছর আগে যখন মানবসমাজ অন্যায়, অবিচার, অশান্তিতে ডুবে গিয়েছিল, মানুষের কোনো অধিকার ছিল না, নারীদের কোনো সম্মান ছিল না, মানবতা যখন ভূলুণ্ঠিত হচ্ছিল তখন সেই সমাজ পরিবর্তনের জন্য মহান আল্লাহ পাঠালেন মানবতার মুক্তির দূত মোহাম্মাদুর রসুলাল্লাহকে (সা.)। তাঁর কাঁধে আল্লাহ দায়িত্ব দিলেন সমগ্র পৃথিবীতে (সকল দীনের উপরে) আল্লাহর দেওয়া হেদায়াহ (সঠিক পথনির্দেশনা) ও সত্যদীন (ইসলাম) প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মানবসমাজ থেকে যাবতীয় অন্যায়, অবিচার অশান্তি দূর করে ন্যায়, সুবিচার ও শান্তি প্রতিষ্ঠা করার। তিনি এই সুমহান লক্ষ্য পূরণের জন্য একটি জাতি গঠন করলেন, এই জাতির নামই উম্মতে মোহাম্মদী। রসুলাল্লাহ (সা.) এই জাতি গঠন করতে গিয়ে অক্লান্ত পরিশ্রম করলেন, কঠোর অধ্যবসায় করলেন, কঠিন সংগ্রাম করলেন। খেয়ে না খেয়ে, কখনো বা গাছের লতা-পাতা খেয়ে, শত্রুর আঘাতে আঘাতে জর্জরিত হয়ে, অপবাদ-জ্বালা, নির্যাতন সহ্য করে, তিনি উম্মতে মোহাম্মদী নামক যে জাতিটি গঠন করলেন তারা ছিল সীসা গলানো প্রাচীরের ন্যায় ঐক্যবদ্ধ, পিপড়ার মতো সুশৃঙ্খল, নেতার প্রতিটি আদেশের ব্যাপারে দ্বিধাহীন আনুগত্যশীল ও আল্লাহর রাস্তায় সংগ্রামে জীবন ও সম্পদ বিলিয়ে দেওয়ার জন্য পাগলপারা। 

রসুলাল্লাহ (সা.) এর নেতৃত্বে এই জাতি সৃষ্টি করল প্রচণ্ড এক গতিশীল সংগ্রাম। শান্তি, সাম্য, ন্যায়, সুবিচার, মানবাধিকার, সমৃদ্ধি প্রতিষ্ঠিত হলো জাজিরাতুল আরবে। এমন নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠিত হলো সেখানে যে, একা একটা যুবতী নারী সমস্ত শরীরে স্বর্ণালঙ্কার পরিহিত অবস্থায় শত শত মাইল পথ পরিভ্রমণ করলেও তার মনে ক্ষতির কোনো আশঙ্কাও জাগ্রত হতো না, স্বর্ণের দোকান খোলা রেখে মানুষ মসজিদে সালাহ আদায় করতে চলে যেত কিন্তু কোনো চুরির ঘটনা ঘটত না। যে আরবদের ঘরে খাবার থাকত না, ক্ষুধার তাড়নায় অজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকত, ডাকাতি ও রাহাজানি যাদের পেশা ছিল সেই আরবরা এমন সমৃদ্ধ হলো যে, যাকাত গ্রহণ করার মতো লোকও খুঁজে পাওয়া কষ্টকর ছিল। বংশ পরম্পরায় যারা গোত্রে গোত্রে যুদ্ধ করত, একে অপরকে হত্যা করত তারাই হয়ে গেল আত্মার ভাই। যারা ছিল স্বার্থপর তারাই হয়ে গেল নিঃস্বার্থ, মানবতার কল্যাণে নিবেদিতপ্রাণ। 

রুফায়দা আল-আসলামিয়া, যিনি ছিলেন ইসলামের প্রথম নারী চিকিৎসক
রুফায়দা আল-আসলামিয়া, যিনি ছিলেন ইসলামের প্রথম নারী চিকিৎসক

রসুলাল্লাহর জীবদ্দশায় ৩২ লক্ষ বর্গকিলোমিটার এলাকায় আল্লাহর দেয়া সত্যদীন প্রতিষ্ঠিত হলো, সমাজ থেকে দাসত্ব দূর হলো, মানুষে মানুষে ভেদাভেদ দূর হলো। যে আরবের ঘরে ঘরে চলছিল দাসত্ব, দাসদেরকে সে সমাজের লোকেরা মানুষই মনে করত না, রাস্তার কুকুরের মতো আচরণ করত তাদের সাথে, অমানবিক নির্যাতন করত দাসদেরকে, ন্যূনতম ব্যক্তিস্বাধীনতাও ছিল না তাদের কিন্তু রসুলাল্লাহ (সা.) মক্কা বিজয়ের পর পূর্বের কৃতদাস, হাবশি (কৃষ্ণাঙ্গ) বেলালকে (রা.) কাবার উপরে উঠালেন, বললেন- বেলাল, আজান দাও। বেলাল (রা.) পবিত্র কাবা ঘরের উপরে দাঁড়িয়ে উচ্চারণ করলেন- আল্লাহু আকবার (আল্লাহ মহান)। যে কাবা ছিল মক্কসহ সমগ্র আরবের মানুষের এবাদতের স্থান, যাকে কেন্দ্র করে সবাই সাজদা করত (এখনো সমগ্র মুসলিম জাতি করে) সেই কাবা আজ কৃতদাস বেলালের (রা.) পায়ের নিচে। রসুলাল্লাহ (সা.) প্রমাণ করে দিলেন মানুষ ঊর্ধ্বে, মানবতা ঊর্ধ্বে, মো’মেনের সম্মান কাবার ঊর্ধ্বে, ধর্ম এসেছে মানবতার কল্যাণে। দাস ব্যবস্থা বিলুপ্ত হলো, মানুষের মুক্তি হলো।

জাহেলিয়াতের সমাজে নারীরা ছিল কেবল ভোগ্য পণ্য, তাদেরকে উলঙ্গ নৃত্য করতে বাধ্য করা হতো, কন্যাশিশুকে জীবন্ত কবর দেওয়া হতো, তাদের যোগ্যতা, জ্ঞান, প্রজ্ঞা, সাহসিকতা ইত্যাদির কোনো মূল্যায়ন ছিল না। নারীরা ছিল এক প্রকার দাসী। রসুলাল্লাহ (সা.) সেই নারীদেরকে কোথায় নিয়ে গেলেন তা একটু খেয়ল করে দেখুন। তিনি নারীদের অধিকার দিলেন, সম্মান দিলেন, দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করে তিনি নারীদেরকে সমাজের সকল কাজে অংশগ্রহণ করার সুযোগ দিলেন এমনকি নারীদেরকে যুদ্ধে পর্যন্ত নিয়ে গেলেন। বাজার ব্যবস্থার প্রধান দায়িত্বে ছিলেন উম্মে শেফা (রা.), হাসপাতালের অধ্যক্ষ ছিলেন রুফায়দাহ (রা.), বহু যুদ্ধ ক্ষেত্রে দুর্ধর্ষ ও বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন উম্মে আম্মারা (রা.), খাওলাসহ (রা.) অনেক নারী আসহাব। ওয়াক্তিয় সালাহ, জুম’আর সালাহ, ঈদের সালাহ, হজ্ব ইত্যাদি সকল ক্ষেত্রেই নারীদের অবস্থান ছিল পুরুষের পাশাপাশি শালীনতার সাথে। 

যে সমাজের মানুষগুলো কাঠ-পাথরের মূর্তির সামনে বুদ হয়ে বসে থাকত, যাদের চিন্তা-চেতনায় ও কর্মে ছিল স্থবিরতা, অন্ধত্ব তাদের মধ্যে যুক্তিবোধের জন্ম হলো, তারা ভাবতে শিখল, চিন্তা করতে শিখল, তাদের চিন্তা-চেতনা ও কর্মে অসম্ভব গতিশীলতা সৃষ্টি হলো, এক কথায় এক সাংঘাতিক রেনেসাঁ সৃষ্টি হলো, জাতির মধ্যে যেন এক নবতর প্রাণের সঞ্চার হলো। যে আরবরা ছিল ভিতু, কাপুরুষ, নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব-সংঘাতে লিপ্ত তাদেরকে ইসপাতকঠিন ঐক্যবদ্ধ এক জাতি বানিয়ে দাঁড় করিয়ে দিলেন তদানীন্তন বিশ্ব-পরাশক্তি রোমান ও পারস্যের বিশাল সেনাবাহিনীর সামনে। রসুলাল্লাহ (সা.) তাদেরকে এমন দুর্ধর্ষ, সাহসী, অপরাজেয় যোদ্ধাজাতিতে পরিণত করলেন যে, তাদের সামনে দুই-দুইটা পরাশক্তি একই সাথে তুলোর মতো উড়ে গেল। 

কী বিস্ময়কর পরিবর্তন করলেন রসুলাল্লাহ (স.)! এক দেহ এক প্রাণ হয়ে বাড়ি ঘর সহায় সম্বল সব কিছু ত্যাগ করে তারা দুনিয়ার বুকে বেরিয়ে পড়লেন। উত্তরে দক্ষিণে পূর্বে পশ্চিমে চারদিকে বেরিয়ে পড়লেন। একদিকে তৎকালীন মহা পরাক্রমশালী রোমান সাম্রাজ্য অপর দিকে অপ্রতিদ্বন্দ্বী পারস্য সাম্রাজ্য। এই উভয় সাম্রাজ্যকে একই সাথে উম্মতে মোহাম্মদী টর্ণেডোর মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে তুলোর মতো উড়িয়ে দিলেন। হয়ে উঠলেন পৃথিবীর বুকে অপপ্রতিরোধ্য সুপার পাওয়ার। পৃথিবীতে এমন কোনো শক্তি রইল না যারা এই উম্মতে মোহাম্মদী, এই মো’মেন, মুসলিমদের সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলে। এই বিরাট বিজয়, এই অপ্রতিরোধ্য ক্ষমতা, সম্পদের প্রাচুর্য উম্মতে মোহাম্মদীর চরিত্রকে এতটুকু পরিমাণ কলুষিত করতে পারেনি যতদিন রসুলাল্লাহ (সা.) এর হাতে গড়া সেই সোনার মানুষগুলো পৃথিবীতে ছিল।

ইসলাম অর্ধপৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত ছিলো
ইসলাম অর্ধপৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত ছিলো

হযরত উমর ফারুক (রা.), যিনি তখন তৎকালীন পৃথিবীর প্রায় অর্ধেক ভূখণ্ডের অধিপতি, তাঁর অধীনে পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী সেনাবাহিনী, তাঁর এক হুকুমে তাঁর জাতির সদস্যগণ জীবন কোরবান করতে পারে, অর্ধ পৃথিবীর সম্পদ তাঁর কথায় বণ্টন করা হয়, দেশ-বিদেশের রাজাধিরাজগণ দূত প্রেরণ করেন তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য কিন্তু তিনি তখনও তাঁর জীবন অতিবাহিত করেন একজন অতি সাধারণ দরিদ্র মানুষের বেশে। তাঁর খুৎবা থামিয়ে দিয়ে একজন সাধারণ মানুষ প্রশ্ন তোলেন তার পোশাক নিয়ে। বাইতুল মাল থেকে বরাদ্দকৃত কাপড় দিয়ে কীভাবে তাঁর জোব্বা তৈরি করা সম্ভব হলো- এমন অসম্মানজনক প্রশ্নের মুখোমুখি হলেন উমর ফারুক (রা.)। কিন্তু তিনি ধমক দিলেন না, এতটুকু রাগ পর্যন্ত করলেন না, শান্তভাবে জবাব দিলেন, বায়তুল মাল থেকে তার সন্তান যে কাপড় পেয়েছিলেন সেই কাপড় বাবাকে দিয়ে দেওয়ার কারণে দু’জনের কাপড় যোগ করে তার জোব্বা তৈরি হয়েছে।