নির্বাচিত লেখা

দক্ষিণ এশিয়ায় ধর্মান্ধতার উত্থান: বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আমাদের করণীয়

জাতীয় প্রেসক্লাবের সন্নিকটে বাগিচা চাইনিজ রেস্টুরেন্টে হেযবুত তওহীদ ঢাকা মহানগর গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বদেরকে নিয়ে একটি গোলটেবিল বৈ......

ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত ও রাষ্ট্রের আইন

প্রকাশিত: নভেম্বর ০২, ২০২১
ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত ও রাষ্ট্রের আইন

আপনার আছে জ্ঞান, আমার আছে অজ্ঞতা। 

আপনার আছে যুক্তি, আমার আছে ধর্মান্ধতা। 

আপনার আছে বিবেক, আমার আছে ধর্মানুভূতি। 

এখন আপনার যুক্তির কথা যদি আমার মূর্খতাকে আঘাত করে, তাহলে সেটাকে আমি ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত বলে দাবি করতে পারব? তখন রাষ্ট্র কি আমার অনুভূতি রক্ষার জন্য আপনার যুক্তির কথাই বন্ধ করে দিবে? যুক্তির চর্চা করার কারণে আপনাকে জেলের ভাত খাওয়াবে?

ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের যে আইন বাংলাদেশে রয়েছে, সেটার মধ্যে নাগরিকের অনুভূতি রক্ষার প্রচেষ্টা রয়েছে, কিন্তু অনুভূতির কোনো সংজ্ঞা দেওয়া হয়নি। কী করলে অনুভূতিতে আঘাত লাগবে সেটা নির্দিষ্টভাবে বলা হয়নি। বলা হয়েছে ধর্মবিশ্বাসে আঘাত করা যাবে না, কিন্তু বিশ্বাসের কোনো সীমারেখা নির্ধারণ করা হয়নি। ফলে ধর্মানুভূতি শব্দটির মধ্যে অনেক বেশি গ্রে এরিয়া রয়ে গেছে, অস্পষ্টতা রয়ে গেছে। কারো ধর্মীয় অনুভূতি শুধু আল্লাহ-রসুলকে গালি দিলে জাগ্রত হয়। কারো আবার ইসলামের নূন্যতম সমালোচনা শুনলেও অনুভূতি জাগ্রত হয়। আবার কারো অনুভূতি আরও এক কাঠি বেশি স্পর্ষকাতর! আল্লাহ, রসুল, কিতাব পরের কথা, হুজুরদের অযৌক্তিক কার্যকলাপের সমালোচনাও সে নিতে পারে না। হুজুরের ভন্ডামীর বিরুদ্ধে কিছু বললেও তার অনুভূতিতে আঘাত লেগে যায়। যেমন সুনামগঞ্জের শাল্লায় অনেকের মামুনুনুভূতিতে আঘাত লেগেছিল। 

বিশ্বাসের কথাই যদি বলেন- তাহলে সেই বিশ্বাসেরও কোনো আগামাথা নাই। ইসলামের নামে হাজার হাজার ভাগ রয়েছে, ফেরকা-মাজহাব-তরিকা রয়েছে। রয়েছে সুফিবাদীদের মধ্যেও হাজারো ধরন। এদের মধ্যে কারো কারো বিশ্বাস একে অপরের সম্পূর্ণ বিপরীত। এই তো কিছুদিন আগেও আমরা দেখতে পেলাম কওমীপন্থীরা আহলে হাদিসের মাদ্রাসা ও মসজিদ ভেঙে গুড়িয়ে দিল। এদের মধ্যে রাষ্ট্র কার বিশ্বাসকে সংরক্ষণ করবে? একজনের বিশ্বাস আরেকজনের বিশ্বাসকে স্বভাবতই আঘাত করে। রাষ্ট্র এর মধ্যে ঢুকলে কোনো কুল-কিনারা পাবে? 

রাষ্ট্র যেটা করতে পারত তাহলো- কেউ কারো উপাস্য, দেব-দেবী, বা নবী-রসুল-অবতারকে গালি দিতে পারবে না, উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অসম্মান করতে পারবে না, এটুকু নিশ্চিত করা। কোর’আনেও আল্লাহ তেমনটাই করেছেন। খুব বেশি ডিটেইলসে যাননি। শুধু বলেছেন- তোমরা অন্য সম্প্রদায়ের উপাস্যদেরকে গালি দিবে না, দিলে তারাও কিন্তু আল্লাহকে গালি দিতে পারে! কত সরল ও সোজা নির্দেশ! অথচ সব সমস্যার নিষ্পত্তি হয়ে যায় এটুকুতেই।

আমাদের রাষ্ট্রও এমন সার্বজনীন মানদণ্ড নির্ধারণ করে আইন তৈরি করলে সেই আইনের অপপ্রয়োগ বন্ধ করা যেত। রাষ্ট্র বলতে পারত- যার যার ধর্মীয় বিশ্বাসের স্বাধীনতা আছে, ধর্মপালনের স্বাধীনতা আছে। সবাই যার যার ধর্ম পালন করবে, কেউ কারো ধর্মপালনে বাধা দিতে পারবে না, কেউ কারো উপাস্য ও নবী-রসুল-অবতারকে গালি দিতে পারবে না। ব্যাস- আর কিছু তো লাগে না। 

পক্ষান্তরে এখন যে আইনটা আছে, সেটা অপরাধকে পূর্ণভাবে সংজ্ঞায়িত করতে পারে না, বরং অপরাধ চিহ্নিত করার বিষয়টি নাগরিকদের উপরেই ছেড়ে দিয়েছে। আর সেটার সুযোগ নিচ্ছে বিভিন্ন মহল। প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার অন্য কোনো উপায় না পেয়ে ধর্মানুভূতির আশ্রয় নিচ্ছে তারা। আল্লাহকে নিয়ে গান গাইলেও তাদের অনুভূতিতে আঘাত লেগে যাচ্ছে। আর এসব দেখিয়ে ধর্মবিদ্বেষীরা বলার সুযাগ পাচ্ছে যে, ইসলাম মানুষের মত প্রকাশের স্বাধীনতা হরণ করতে চায়।